আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পাশাপাশি বাদ দেওয়া হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে চালু হওয়া সিঙ্গুর আন্দোলন সংক্রান্ত অধ্যায়ও। সোমবার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে শ্যামাপ্রসাদের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উল্লেখ্য, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা আরএসএসের রাজনৈতিক শাখার এই নেতা ১৯০৬ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন।
পাঠ্যক্রমে কী থাকছে
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ গঠনে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা, তাঁর দেশপ্রেম, অখণ্ড ভারতের ধারণা এবং বিশেষত বাংলাকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান— এই সমস্ত বিষয় আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে ছাপা, পঠিত এবং আলোচিত হওয়া উচিত। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের দুই শিক্ষামন্ত্রী।
পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, বিধানসভায় শ্যামাপ্রসাদের ভাষণ, কেন্দ্রীয় সরকারে শিল্পমন্ত্রী-সহ একাধিক দায়িত্ব পালন, স্বাধীনতা-উত্তর ভারত গঠনে তাঁর অবদান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই বিষয়গুলি পড়া এবং জানা উচিত।
সিঙ্গুর অধ্যায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাটাদের ন্যানো প্রকল্প সিঙ্গুর থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া উচিত বলে তিনি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষাসচিবের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে ভবানীপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে তিনি কেবল প্রস্তাব দিতে পারেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পাঠ্যক্রম কমিটি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং শিক্ষাসচিব বিনোদ কুমার।
সিঙ্গুর অধ্যায়ের ইতিহাস
২০০৮ সালে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঘটনাকে রাজ্যে শিল্পস্থানান্তর এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কট ত্বরান্বিত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করে বিজেপি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় সিঙ্গুর আন্দোলনকে স্কুল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা করেছিলেন। পরের বছর অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বই ‘অতীত ও ঐতিহ্য’-এ জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী এই আন্দোলন নিয়ে সাত পাতার একটি অধ্যায় যুক্ত করা হয়। মে মাসে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই দলের শিক্ষক সংগঠন এই অধ্যায় বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল।
শিক্ষক সংগঠনের এক সদস্যের বক্তব্য, রাজ্য সরকার যখন শ্যামাপ্রসাদকে যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখন সিঙ্গুর অধ্যায় বাদ পড়া এবং সেই জায়গা শ্যামাপ্রসাদ সংক্রান্ত পাঠ দিয়ে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনাই স্বাভাবিক।
মিত্র ইনস্টিটিউশনের সংস্কার ও স্মৃতিরক্ষা
অনুষ্ঠানে মিত্র ইনস্টিটিউশনের সংস্কারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করেন শুভেন্দু। তিনি জানান, আগের সরকারের কাছে স্কুলের তরফে সংস্কারের জন্য আবেদন জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে ভবানীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, পিএম শ্রী প্রকল্পের আওতায় মিত্র ইনস্টিটিউশনের আধুনিকীকরণ করা হবে। স্কুলটিকে একটি বিশেষ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাজ্যের স্কুলশিক্ষা সচিবের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া, শ্যামাপ্রসাদের স্মরণে ১২৫ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
নিজের বক্তব্যে শুভেন্দু বলেন, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলাকে ভারতভুক্ত করার পিছনে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা না থাকলে আজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হতে হত। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার শ্যামাপ্রসাদের আদর্শ অনুসরণ করেই কাজ করবে। বাম আমলের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকালে শ্যামাপ্রসাদের অবদান ও আত্মত্যাগ ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পালিত জন্মজয়ন্তী
রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, সমস্ত রাজ্য-সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষক ও কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদের জন্মজয়ন্তী পালন এবং সেই দিনই অনুষ্ঠানের ছবি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পার্ক স্ট্রিটের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজেও এই দিন পালিত হয়। অধ্যক্ষ ফাদার ডমিনিক স্যাভিও শিক্ষা ও জাতি গঠনে শ্যামাপ্রসাদের অবদান নিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং সততা, সেবা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের মূল্যবোধ বজায় রাখার আহ্বান জানান উপস্থিত সকলের কাছে।
লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ইতিহাসবিদ তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস শ্যামাপ্রসাদের জীবন ও কাজ নিয়ে একটি বক্তৃতা দেন। উল্লেখ্য, ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব সামলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ নিজেই। কলেজে একটি কুইজ় এবং প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। অধ্যক্ষা শিউলি সরকার জানান, অনুষ্ঠানের জিও-ট্যাগযুক্ত ছবি উচ্চশিক্ষা দফতরে পাঠানো হয়েছে কমপ্লায়েন্স রিপোর্টের অংশ হিসেবে।
সারাদিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও, যার উপাচার্য পদে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ স্বয়ং। বর্তমান উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ জানান, শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সারা বছর ধরে নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়।
সৌজন্যে: সংবাদসংস্থা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অবলম্বনে

