সম্পাদকীয় ডেস্ক: ঝাড়খণ্ডে JPSC এবং JSSC পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মের প্রতিবাদে তরুণদের চলমান আন্দোলন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে দেশের বেকারত্ব সমস্যার গভীরতা। একটা সাম্প্রতিক পত্রিকা কলামে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে দিল্লি থেকে কর্ণাটক, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের এই অসন্তোষ আসলে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটা ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। শিক্ষিত বেকারত্বকে এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি শূন্যপদ পূরণের উপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কলামিস্ট।
গত কয়েক মাসে দিল্লি থেকে রাঁচি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র এবং তরুণদের প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় এনেছে একটা পুরনো প্রশ্ন, দেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম আসলে কতটা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখা যেতে পারে, আবার একটা বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখা সম্ভব, যেখানে সারা দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের একই রকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বেকারত্বের ভয়াবহ চিত্র
ভারতের Gen Z জনসংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি ৭০ লক্ষ, যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ স্নাতক তৈরি হচ্ছেন, যাদের মধ্যে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার থেকে যাচ্ছেন। ২৯ বছর বয়সে এসে এই হার ২০ শতাংশে নেমে এলেও, এর অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, বরং অনেকেই হতাশ হয়ে যা পাচ্ছেন তাই কাজ হিসেবে গ্রহণ করছেন। দেশের ৮০ শতাংশ কলেজ এখন বেসরকারি, ফলে একটা সাধারণ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করাও আর সস্তা নয়। এত খরচ করে ডিগ্রি নেওয়ার পর যদি মানসম্পন্ন কাজ বা কোনো কাজই না মেলে, তাহলে সেটাকে বিনিয়োগের বিপরীতে একটা খুবই দুর্বল প্রতিদান বলেই মনে করা হচ্ছে।
ঝাড়খণ্ডের প্রতিবাদ কী নিয়ে
ঝাড়খণ্ডে চলমান প্রতিবাদের মূল কারণ JPSC এবং JSSC পরীক্ষায় বিভিন্ন অনিয়ম। যেখানে সরকারি স্থায়ী চাকরির সুযোগ এমনিতেই সীমিত, সেখানে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের শুরুতে উত্তরপ্রদেশে মাত্র ৬০ হাজার কনস্টেবল পদের জন্য প্রায় ৪৮ লক্ষ প্রার্থী আবেদন করেছিলেন, আর সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর জনরোষ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো, যেমন প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি বা নিয়োগে বিলম্ব, তরুণদের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয় বলেই মত বিশ্লেষকদের।
কেন এত কম সরকারি চাকরি
এই সমস্যার পেছনে মূলত দুটো কারণের কথা উঠে আসছে। প্রথমত, বেসরকারি ক্ষেত্র প্রয়োজনীয় হারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় স্তরের সরকারই অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রেখে দিচ্ছে। ২০২২ সালের একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে মোট সরকারি শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় স্তরেই রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ পদ।
শূন্যপদ রেখে দেওয়ার নীতিগত কারণ
আর্থিকভাবে চাপে থাকা রাজ্য সরকারগুলোর কাছে শূন্যপদ পূরণ না করাটা একদিকে নীতি, অন্যদিকে বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখা হয়। এটাকে অর্থনৈতিক সাশ্রয় বলে মনে করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটা আদতে ভবিষ্যতের সঙ্গে একধরনের আপোস বলেই মত অনেকের। উদাহরণস্বরূপ, কর্ণাটকে সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে স্কুল শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর।
এই বিশ্লেষণ এবং তার প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক এই পত্রিকা কলামে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে রাজ্যগুলো শাসন এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগে কার্পণ্য করছে কারণ ভোটমুখী বিভিন্ন নগদ সহায়তা প্রকল্প তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল করে দিয়েছে। এই ধরনের জনমুখী প্রকল্প বা “ফ্রিবি” নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে, যেখানে একদল একে জনকল্যাণমূলক নীতি হিসেবে দেখেন, আবার অন্য একটা অংশ একে রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। এই নির্দিষ্ট কলামে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের জন্য এই ধরনের ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বেকার তরুণ প্রজন্মকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। তবে এটা একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, আর এই বিষয়ে ভিন্নমতও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মহলে যথেষ্ট রয়েছে।
উপসংহার
ঝাড়খণ্ড থেকে দিল্লি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের এই ধারাবাহিক প্রতিবাদ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শিক্ষিত বেকারত্ব এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং একটা জাতীয় স্তরের উদ্বেগের বিষয়। সরকারি শূন্যপদ পূরণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা রক্ষা এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, এই তিনটে বিষয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া আগামী দিনে এই ধরনের প্রতিবাদ যেকোনো সময় দেশের যেকোনো প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এই সমস্যার সমাধানের পথ নিয়ে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মহলে মতভেদ থেকেই যাচ্ছে, বিশেষ করে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বনাম কাঠামোগত সংস্কার, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নে।

