পূর্ব ভারতে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে তুলে ধরার লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করল জাপানি শিল্পগোষ্ঠী মিৎসুবিশি। রাজ্যে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কারখানা স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বুধবার এই তথ্য জানান রাজ্যের শিল্প, বাণিজ্য ও উদ্যোগ দফতরের মন্ত্রী তাপস রায়।
প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, সম্ভাব্য জমির উল্লেখ
মার্চেন্টস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, ওই দিনই সকালে মিৎসুবিশির একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজ্যে প্রস্তাবিত সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট গড়ে তোলার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন প্রতিনিধিরা।
মন্ত্রীর কথায়, “মিৎসুবিশির প্রতিনিধি দল পশ্চিমবঙ্গে একটি সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দুর্গাপুর অথবা পানাগড়ে জমি দেওয়া যেতে পারে, এবং আলোচনা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চলতি মাসেই সংস্থার কর্তারা ফের রাজ্যে আসবেন।” তবে প্রকল্পের বিনিয়োগের পরিমাণ বা চূড়ান্ত সময়সীমা সংক্রান্ত আরও কোনও তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি।
মন্ত্রী জানান, এই বৈঠকে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী এবং প্রশাসনের একাধিক শীর্ষ আধিকারিকও উপস্থিত ছিলেন, যা উন্নত উৎপাদন ক্ষেত্রে বড় মাপের বিনিয়োগ টানতে রাজ্য সরকারের আন্তরিকতারই ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
পূর্ব ভারতের বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বাংলা
তাপস রায় জানান, ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ তৈরি, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প-প্রণোদনা এবং শিল্প মহলের সঙ্গে অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলাই রাজ্য সরকারের মূল লক্ষ্য, যাতে পূর্ব ভারতে বিনিয়োগের প্রথম পছন্দের রাজ্য হয়ে উঠতে পারে পশ্চিমবঙ্গ।
তিনি আরও জানান, একদিকে পাট এবং চা শিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্রগুলির আধুনিকীকরণে জোর দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম মেধা, ডেটা সেন্টার এবং গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (জিসিসি)-র মতো উদীয়মান শিল্পক্ষেত্রকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে রাজ্যের শিল্প কাঠামোয় ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানান মন্ত্রী।
নতুন শিল্প নীতি এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রণোদনা
মন্ত্রী জানান, একটি খসড়া শিল্পনীতি তৈরির কাজ চলছে, যা শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে। তাঁর কথায়, এই নীতির কেন্দ্রে থাকবে রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টিও। প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে অন্য রাজ্যগুলির সমতুল্য শিল্প-প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অন্য রাজ্যগুলি যে ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে, তার সমতুল্য প্রণোদনা আমাদেরও দিতে হবে।”
শিল্প করিডর ও ক্লাস্টার গড়ে তোলা, সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করা এবং বিশেষত কৃত্রিম মেধা ও নতুন প্রযুক্তি ক্ষেত্রে একটি প্রাণবন্ত স্টার্টআপ পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
শেয়ার বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং সিন্ডিকেট-মুক্ত পরিবেশের প্রতিশ্রুতি
তাপস রায় জানান, রাজ্যের লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি (পিএসইউ) চিহ্নিত করে সেগুলিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট-সংক্রান্ত কার্যকলাপ থেকে ব্যবসায়ী মহলকে সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
মন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যের যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি এবং পশ্চিমবঙ্গকে ফের একটি প্রধান শিল্পকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শিল্পের পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আগ্রহ
সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বর্তমানে ভারতের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র। দেশ জুড়ে একাধিক রাজ্য এই শিল্প আকৃষ্ট করতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, কারণ এই ধরনের প্রকল্প শুধু বিপুল বিনিয়োগই আনে না, সঙ্গে দক্ষ কর্মসংস্থান এবং সহায়ক শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলও গড়ে তোলে। জাপানের মতো প্রযুক্তি-অগ্রণী দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আগ্রহ প্রকাশ পশ্চিমবঙ্গের জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন শিল্পমহলের একাংশ। দুর্গাপুর এবং পানাগড়ের মতো এলাকায় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো আগে থেকেই কিছুটা প্রস্তুত থাকায়, এই দুই সম্ভাব্য স্থান নিয়ে আলোচনা প্রকল্পটিকে বাস্তবায়নের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা শিল্পমহলের। তবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর করার সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়, যা চলতি মাসের পরবর্তী বৈঠকের পরই আরও স্পষ্ট হতে পারে।

