জাকার্তা: প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছল। ইন্দোনেশিয়াকে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং অস্ত্র বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে সম্মত হল ভারত। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দু’দিনের ইন্দোনেশিয়া সফরের সময়ে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ২০২৩ সালের পর এই প্রথম ইন্দোনেশিয়ায় পা রাখলেন মোদী।
ব্রহ্মস চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
জাকার্তায় এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র সংস্থা এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক একটি চুক্তিতে সই করেছে। যদিও এই চুক্তির আর্থিক অঙ্ক নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ২০ থেকে ৩৫ কোটি ডলারের একটি সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছিল ব্রহ্মস। এর আগে প্রতিবেশী দেশ ভিয়েতনাম এবং ফিলিপিন্সের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি সেরে ফেলেছে সংস্থাটি।
এই সফরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা সংস্থা রিপাবলিকর্প এবং ভারতের ভারত ডায়নামিক্সের মধ্যে, যা বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত।
দুই নেতার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অবশ্য এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে সরাসরি কোনও উল্লেখ ছিল না।
খনিজ, ইস্পাত ও বাণিজ্যে নতুন অংশীদারি
শুধু প্রতিরক্ষা নয়, দুই দেশের মধ্যে মোট ১৪টি চুক্তি ও সমঝোতাপত্র সাক্ষরিত হয়েছে এই সফরে। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ইস্পাত সরবরাহ শৃঙ্খল, কৃষি, ওষুধ, শিক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, উদ্ভাবন, টেলিযোগাযোগ এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্র। স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতাউ স্টিল স্টেনলেস স্টিল স্ল্যাব উৎপাদনের জন্য একটি যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলবে বলেও জানা গিয়েছে।
মোদী তাঁর বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আর সেই লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ইস্পাত ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খল মজবুত করতে একটি বড় চুক্তি হয়েছে। স্টেনলেস স্টিল এবং বিরল মৃত্তিকা চুম্বক নিয়েও দুই দেশের সংস্থাগুলির মধ্যে নতুন অংশীদারির সূচনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রাবোও জানান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের দুই বৃহত্তম গণতন্ত্রের অন্যতম, আর তাদের মধ্যে অংশীদারি গোটা অঞ্চলের জন্যই লাভজনক হবে। দুই দেশ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার গতি বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সাবাং বন্দর উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ
কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সাবাং বন্দরের যৌথ উন্নয়নেও সম্মত হয়েছে দুই দেশ। মালাক্কা প্রণালীর কাছে অবস্থিত এই বন্দরটি ভারতের গ্রেট নিকোবর বন্দর প্রকল্প থেকে মাত্র শ’খানেক মাইল দূরে অবস্থিত, যা ভারত মহাসাগরে ভারতের সামুদ্রিক কৌশলের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মোদী জানান, দুই দেশের মধ্যে ২০১৮ সালে গড়ে ওঠা ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারি এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। ব্যাঙ্গালোর আইআইএম-এর একটি শাখা ক্যাম্পাস ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে তোলার সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থা ইন্দোনেশিয়ার পেমেন্ট পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে বলেও জানান তিনি, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটন আরও সহজ করবে।
সমুদ্র অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং বন্দর উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই পক্ষ।
বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয় মোদী ও প্রাবোওর মধ্যে। মোদী বলেন, বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার এই পরিস্থিতিতে কূটনীতি ও আলোচনার গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। প্যালেস্তাইন প্রশ্নে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পক্ষেই ভারতের অবস্থান বলে ফের স্পষ্ট করেন তিনি।
বৈঠক শেষে মোদী অস্ট্রেলিয়া ও নিউজ়িল্যান্ড সফরে রওনা দেবেন বুধবার।
মোদীকে ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান
সফরের মধ্যেই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকল জাকার্তা। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘বিন্তাং আদিপুর্ণ অফ দ্য রিপাবলিক অফ ইন্দোনেশিয়া’ পদকে ভূষিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো নিজে এই পদক তুলে দেন মোদীর হাতে।
১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এই সম্মান ইন্দোনেশিয়ার একতা, ধারাবাহিকতা এবং সমৃদ্ধিতে অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের দেওয়া হয়ে থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তরফে সমাজমাধ্যমে জানানো হয়, এই সম্মান আসলে কোটি কোটি ভারতবাসীর প্রাপ্য, এবং এটি ভারত-ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক ও আন্তরিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এবং ইন্দোনেশিয়ার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোদী।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এই সম্মানকে ভারত-ইন্দোনেশিয়া বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, দুই দেশের বন্ধুত্ব দৃঢ় করা এবং ইন্দোনেশিয়ার একতা ও সমৃদ্ধিতে মোদীর নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেওয়া হয়েছে।
বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও এই সম্মানকে ভারত-ইন্দোনেশিয়া ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারি গভীর করা এবং ভারত-আসিয়ান সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রে মোদীর প্রচেষ্টার প্রতিফলন বলে বর্ণনা করেন। গোটা দেশের কাছেই এই মুহূর্ত গর্বের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সৌজন্যে: সংবাদসংস্থা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অবলম্বনে

