প্রতিরক্ষা, বিশুদ্ধ জ্বালানি, ওষুধশিল্প এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা— একাধিক ক্ষেত্রে ভারত ও বেলজিয়ামের সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হল দুই দেশের প্রথম কৌশলগত সংলাপে। বুধবার বেলজিয়ামের উপ-প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভোর সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। দু’দিনের ব্রাসেলস সফরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি। জয়শঙ্কর নিজেই জানান, পশ্চিম এশিয়া-সহ বিশ্বের নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে একটি কার্যকর মতবিনিময় হয়েছে এই সফরে।
কৌশলগত সংলাপের সূচনা
উদ্বোধনী ভাষণে জয়শঙ্কর জানান, বিশুদ্ধ জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীববিজ্ঞান, রাসায়নিক শিল্প, রসদ সরবরাহ এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে দুই দেশের সামনে। ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেলজিয়ামের একটি বিশেষ গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক অংশীদারি যত গভীর হচ্ছে এবং ভারত-ইইউ সম্পর্ক যত বেশি কৌশলগত রূপ নিচ্ছে, ততই এই সংলাপ বাস্তব ফলাফল আনতে সাহায্য করবে দুই দেশ এবং বৃহত্তর ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, উৎপাদনের উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বাজারে প্রবেশাধিকার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কখনও কখনও প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা— এই সমস্যাগুলি সামলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, ঝুঁকি কমানো এবং বৈচিত্র্যময় করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা, ইউক্রেন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সংঘাত ও উত্তেজনার প্রভাব যে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতেই অনুভূত হচ্ছে, সে কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বাণিজ্য চুক্তির বাইরেও বড় গুরুত্ব
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ কৌশলগত চরিত্র নিচ্ছে বলে জানান জয়শঙ্কর। তাঁর কথায়, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে নিছক একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে না দেখে তার চেয়েও অনেক বড় প্রেক্ষাপটে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা নিজের দেশের মানুষকে বুঝিয়েছেন তিনি।
পরবর্তীতে সমাজমাধ্যমে জয়শঙ্কর জানান, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিনিয়োগ, বিশুদ্ধ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং ওষুধশিল্প— এই সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতার পর্যালোচনা হয়েছে বৈঠকে। বন্দর, সামুদ্রিক ক্ষেত্র, সেমিকন্ডাক্টর এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি হ্রাসে বৃহত্তর সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বেলজিয়ামের প্রতিক্রিয়া
বেলজিয়ামের বিদেশমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো জানান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে নিয়মিত আদানপ্রদানেই স্পষ্ট, ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক ইতিমধ্যেই যথেষ্ট মজবুত। গত বছর ভারতে যাওয়া বেলজিয়ামের অর্থনৈতিক প্রতিনিধি দলের সফরেও দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
কৌশলগত সংলাপ চালু হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এখন থেকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এগোবে বলে জানান প্রেভো। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে বিশুদ্ধ জ্বালানি, উদ্ভাবন, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে বলেও মন্তব্য তাঁর। জয়শঙ্কর সঙ্গে খোলামেলা এবং গঠনমূলক আলোচনার প্রশংসা করে ভারত-বেলজিয়াম অংশীদারিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই কৌশলগত সংলাপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত এবং ব্যাপক অংশীদারির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা নিয়মিত এবং ফলাফলমুখী রাজনৈতিক আলোচনার কাঠামো তৈরি করবে।
ইউরোপীয় নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক
শুধু বেলজিয়াম নয়, ব্রাসেলস সফরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক শীর্ষ কর্তার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। ভারত-ইইউ ব্যবসায়িক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে ভারত-ইউরোপ সম্পর্কের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থার কথা তুলে ধরেন তিনি। এ ছাড়া ইইউ-র স্টার্টআপ, গবেষণা এবং উদ্ভাবন বিষয়ক কমিশনার একাতেরিনা জ়াহারিয়েভার সঙ্গে বৈঠকে বিশুদ্ধ ও সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তি, উদ্ভাবন কেন্দ্র, স্টার্টআপ এবং হরাইজ়ন ইউরোপের সঙ্গে যুক্ততা নিয়ে আলোচনা করেন জয়শঙ্কর।
আন্তর্জাতিক অংশীদারি বিষয়ক ইউরোপীয় কমিশনার জোজ়েফ সিকেলার সঙ্গে বৈঠকে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ত্রিপাক্ষিক অংশীদারি, ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর এবং সবুজ জাহাজ পরিবহণে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়েও কথা হয় তাঁর। এর আগে ইউরোপীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা, ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস, ফ্লান্ডার্সের মন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট মাথিয়াস দিপেনদায়েলে এবং মন্ত্রী অ্যানিক দে রিডারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর।
বাণিজ্য ও প্রযুক্তি পরিষদের বৈঠকেও অংশগ্রহণ
শুধু দ্বিপাক্ষিক সংলাপ নয়, ব্রাসেলস সফরে ভারত-ইইউ বাণিজ্য ও প্রযুক্তি পরিষদের (টিটিসি) একটি ফলপ্রসূ বৈঠকেও অংশ নেন জয়শঙ্কর। তাঁর সঙ্গে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ এবং প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক অজয় কে সুদ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফে নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনা ভির্ককুনেন এবং কমিশনার একাতেরিনা জ়াহারিয়েভা ও মারোস শেফচোভিচের আলোচনাকে কার্যকর বলে উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর।
তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি যখন সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্কট, বাজারে প্রবেশাধিকারের সমস্যা এবং প্রযুক্তিগত ফারাকের মুখোমুখি, তখন ভারত ও ইইউ-র মতো বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিই ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে। কৌশলগত প্রযুক্তি, ডিজিটাল সংযোগ, বিশুদ্ধ জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সহনশীল সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে চলমান সহযোগিতার পর্যালোচনা হয় বৈঠকে। এ ছাড়া উদীয়মান প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিপ-টেক স্টার্টআপ, সবুজ হাইড্রোজেন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারির মতো ক্ষেত্রেও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, নিরাপত্তা-প্রতিরক্ষা অংশীদারি এবং গতিশীলতা কাঠামোর সূত্র ধরে তৈরি হওয়া বর্তমান গতি এই বৈঠকের মাধ্যমে আরও এগিয়ে যাবে বলে আশাপ্রকাশ করেন জয়শঙ্কর।
ব্যবসায়িক গোলটেবিলেও যোগদান
ভারত-ইইউ ব্যবসায়িক গোলটেবিল বৈঠকেও অংশ নেন জয়শঙ্কর, যেখানে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সহকর্মীরা, ফ্লান্ডার্স ও ওয়ালোনিয়ার মন্ত্রী-প্রেসিডেন্টরা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। গভীর ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং গবেষণা-উন্নয়ন সহযোগিতার প্রতি অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ইউরোপের সঙ্গে ভারতের অংশীদারিতে ক্রমবর্ধমান আস্থা এবং স্বাচ্ছন্দ্যের কথা তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এই আস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে, আর এখন দুই পক্ষের ব্যবসায়ী মহলকেই এই সম্পর্কের সম্ভাবনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
উপসংহার
প্রথম ভারত-বেলজিয়াম কৌশলগত সংলাপ, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি পরিষদের বৈঠক এবং ব্যবসায়িক গোলটেবিল— এই ব্রাসেলস সফরের মধ্য দিয়ে একসঙ্গে একাধিক স্তরে এগিয়েছে ভারত-ইউরোপ সম্পর্ক। দ্বিপাক্ষিক অংশীদারির পাশাপাশি প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রেও একযোগে আলোচনা এগোনোয়, বিশ্লেষকদের মতে এই সফরকে ভারত-ইইউ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং নিয়মিত এই সংলাপগুলি কতটা বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত হয়, সে দিকেই এখন নজর থাকবে কূটনৈতিক মহলের।

