অস্কারজয়ী পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি ‘দ্য ওডিসি’ মুক্তির আগেই দুই ফ্রন্টেই বাজিমাত করতে চলেছে— একদিকে সমালোচকদের কাছ থেকে পেয়েছে প্রায় সর্বসম্মত প্রশংসা, অন্যদিকে বক্স অফিসের পূর্বাভাসও বলছে নোলানের কেরিয়ারের অন্যতম বড় সূচনার ইঙ্গিত। ২০২৩ সালের ‘ওপেনহাইমার’-এর পরে এটাই নোলানের প্রথম ছবি, যা তৈরি হয়েছে হোমারের প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য অবলম্বনে। এই সপ্তাহে যুক্তরাজ্য ও আমেরিকা দুই জায়গাতেই মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি।
গল্প এবং কুশীলব
ট্রয়ের যুদ্ধ শেষে নিজের রাজ্য ইথাকায় ফিরতে চাওয়া রাজা ওডিসিয়াসের দীর্ঘ ও বিপদসঙ্কুল যাত্রা নিয়েই এগিয়েছে ছবির কাহিনি, যেখানে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় নানা পৌরাণিক দানব এবং অতিপ্রাকৃত শক্তির। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন, তাঁর স্ত্রী পেনেলোপির চরিত্রে অ্যান হ্যাথাওয়ে এবং পুত্র টেলিমেকাসের চরিত্রে টম হল্যান্ড। এ ছাড়া ছবিতে রয়েছেন রবার্ট প্যাটিনসন, শার্লিজ থেরন, জেনডায়া এবং লুপিটা নিয়ংগো। প্রায় আড়াইশো মিলিয়ন ডলার বাজেটে সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ক্যামেরায় শুট করা হয়েছে ছবিটি।
সমালোচকদের প্রশংসার বন্যা
একাধিক প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ছবিটিকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভ্যারাইটির পর্যালোচনায় ছবির প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য জুড়ে একের পর এক দুর্দান্ত দৃশ্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যার প্রতিটিই আলাদাভাবে অন্য যে কোনও গ্রীষ্মকালীন ব্লকবাস্টারের মধ্যমণি হতে পারত বলে মত পত্রিকাটির। মেট্রো পাঁচ তারকা দিয়ে ছবিটিকে চলচ্চিত্র নির্মাণের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছে, আর টেলিগ্রাফ একে বছরের সেরা ছবি বলে ঘোষণা করেছে।
গার্ডিয়ানের সমালোচনায় ছবির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাহসিকতা এবং আন্তরিকতার প্রশংসা করা হয়েছে, পাশাপাশি পাঁচ তারকা দিয়েছে এম্পায়ার পত্রিকাও, যারা একে মহাকাব্যিক আকারের প্রকৃত সংজ্ঞা বলে বর্ণনা করেছে। বিবিসি-র পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ওপেনহাইমার তার একক-কেন্দ্রিক গঠনের জন্য এখনও নোলানের সবচেয়ে নিখুঁত ছবি হলেও, ‘দ্য ওডিসি’-র জাদু এবং মানবিকতা এতটাই সমৃদ্ধ যে তা আবার দেখার আগ্রহ জাগায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, তিন হাজার বছরের পুরনো একটি কবিতাকে পুরনো হলিউডি আকর্ষণসমৃদ্ধ, বুদ্ধিদীপ্ত ছবিতে রূপান্তরিত করেছেন নোলান।
অভিনয়েও প্রশংসিত কলাকুশলীরা
শুধু নির্মাণশৈলীই নয়, অভিনয়শৈলীর জন্যও প্রশংসিত হয়েছেন ছবির কুশীলবরা। দ্য হলিউড রিপোর্টারের সমালোচনায় ছবিটিকে কিছুটা অসম বলা হলেও, ম্যাট ডেমনের অভিনয়কে তাঁর আগের যে কোনও চরিত্রের তুলনায় অনেক বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং শক্তিশালী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডেডলাইনের পর্যালোচনায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে টম হল্যান্ডের নাম, যাঁর অভিনয়কে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়াও
তবে সব প্রতিক্রিয়াই যে একপেশে প্রশংসাসূচক, তা নয়। ফিনান্সিয়াল টাইমসের সমালোচনায় ছবির সংলাপে সমকালীন ভাষার ব্যবহার নিয়ে খানিকটা আপত্তি তোলা হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের সমালোচনায় বলা হয়েছে, মূল আখ্যানের তুলনায় ওডিসিয়াস চরিত্রের অহংকার এবং জটিলতাকে কিছুটা লঘু করে দেখানো হয়েছে ছবিতে। দ্য ইকোনমিস্ট আরও কঠোর সুরে ছবিটিকে হোমারের রচনার একটি অতিরিক্ত সরলীকৃত রূপান্তর বলে অভিহিত করেছে, আর দ্য নিউ ইয়র্কারের মতে, প্রাচীন বিশ্বকে তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে বোঝার চেষ্টার বদলে একজন আধুনিক, সহজবোধ্য ওডিসিয়াসকেই তুলে ধরেছেন নোলান।
নোলানের ছবিতে সংলাপ পরিষ্কারভাবে শোনা না যাওয়ার অভিযোগও নতুন নয়, আর এবারও কিছু সমালোচক একই সমস্যার কথা তুলেছেন— যার একটা বড় কারণ শুটিংয়ের সময়ে ধারণ করা মূল শব্দই ব্যবহার করার প্রতি নোলানের দীর্ঘদিনের পছন্দ।
বক্স অফিসে রেকর্ড গড়ার পথে
সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি বক্স অফিসের হিসেবেও চমক দিতে চলেছে ‘দ্য ওডিসি’। সাম্প্রতিক শিল্পক্ষেত্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৩৯০০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে প্রথম সপ্তাহান্তেই ছবিটি ঘরোয়া বাজারে আয় করতে পারে প্রায় ৮৫ থেকে ১০৫ মিলিয়ন ডলার, আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যোগ হতে পারে আরও প্রায় ১১০ মিলিয়ন ডলার। এই হিসেব সত্যি হলে বিশ্বব্যাপী প্রথম সপ্তাহান্তের আয় দাঁড়াতে পারে ২০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা ‘ওপেনহাইমার’-এর প্রথম সপ্তাহান্তের বিশ্বব্যাপী আয়কেও ছাপিয়ে যাবে।
এই পরিসংখ্যান সত্যি হলে ২০১২ সালের ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’-এর পরে এটাই হতে চলেছে নোলানের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় সূচনা। তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত রেটিং সত্ত্বেও এত বড় আয়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে মূলত আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার প্রদর্শনীর জন্য এক বছর আগে থেকেই বিক্রি হয়ে যাওয়া টিকিটের কারণে। এই সপ্তাহান্তে বাজারে কোনও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছবি না থাকায় বক্স অফিসের শীর্ষস্থান নিয়েও কোনও সংশয় নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উল্লেখ্য, ‘ওপেনহাইমার’ মুক্তির সময়ে যে বিপুল আয় করেছিল, তার পিছনে অনেকটা কৃতিত্ব ছিল ‘বার্বেনহাইমার’ ভাইরাল ট্রেন্ডের, যেখানে দর্শকেরা একই দিনে ‘বার্বি’ এবং ‘ওপেনহাইমার’ দুটি ছবিই দেখার টিকিট কেটেছিলেন। এবার সেই ধরনের কোনও সহায়ক ট্রেন্ড ছাড়াই একা হাতে বাজার মাতানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েই মাঠে নামছে ‘দ্য ওডিসি’।
উপসংহার
ইন্টারস্টেলার, ডানকার্ক, ইনসেপশনের মতো ছবির পরে ক্রিস্টোফার নোলানের কাছ থেকে দর্শকদের প্রত্যাশা এমনিতেই বরাবর আকাশছোঁয়া থাকে, আর ‘দ্য ওডিসি’ সমালোচকদের প্রশংসা এবং বক্স অফিসের পূর্বাভাস— দুই ক্ষেত্রেই সেই প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি ছাপিয়েও যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে এখনই। প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্যকে আধুনিক ব্লকবাস্টারের আকারে তুলে ধরার এই সাহসী প্রচেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে সমালোচিত হলেও, সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া এবং টিকিট বিক্রির প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নোলান ফের একবার চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের সীমানা একসঙ্গে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছেন। মুক্তির সপ্তাহান্তের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে, এই পূর্বাভাস বাস্তবে কতটা মিলে যায়।

