নয়াদিল্লি: ভারতের রেল পরিবহণে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার হরিয়ানার জিন্দ রেলওয়ে স্টেশন থেকে দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন। একইসঙ্গে তিনি হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও পাঞ্জাবে ১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন এবং একাধিক নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই ট্রেনের সূচনার মাধ্যমে ভারত বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি দেশের তালিকায় যুক্ত হল, যেখানে ইতিমধ্যেই হাইড্রোজেন প্রযুক্তিভিত্তিক রেল পরিষেবা চালু হয়েছে।
জিন্দ-সোনিপত রুটে চলবে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনটি হরিয়ানার জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত প্রায় ৮৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেনটি দুই দফা যাতায়াত করবে এবং পথে ১২টি স্টেশনে থামবে।
ট্রেনটি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলবে। ফলে ডিজেলের পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার হওয়ায় পরিবেশে কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এই প্রযুক্তির একমাত্র উপজাত হল জলীয় বাষ্প, যা একে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব রেল পরিষেবায় পরিণত করেছে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ১০ কোচের ট্রেন
এই ট্রেনে রয়েছে মোট ১০টি কোচ, যার মধ্যে দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রীবাহী কোচ।
ট্রেনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:
- মোট আসন সংখ্যা: ৬৮২
- মোট যাত্রী বহন ক্ষমতা: প্রায় ২,৬০০
- সর্বোচ্চ পরিচালন গতি: ৭৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা
- হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা
- কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং কম দূষণ
রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম তিন মাস ট্রেনে বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিবিদরা উপস্থিত থাকবেন, যাতে যাত্রাপথে কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান করা যায়।
‘হাইড্রোজেন ফর হেরিটেজ’ প্রকল্পের প্রথম ধাপ
এই ট্রেনটি ভারতীয় রেলের ‘Hydrogen for Heritage’ কর্মসূচির অংশ। ভবিষ্যতে দেশের ঐতিহ্যবাহী, পাহাড়ি এবং অ-বৈদ্যুতিক রেলপথে ধাপে ধাপে ৩৫টি হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুতায়ন কঠিন এমন রুটেও আধুনিক ট্রেন পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন
শুধু হাইড্রোজেন ট্রেন নয়, এদিন প্রধানমন্ত্রী মোদী ১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এই প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে—
- নতুন রেল অবকাঠামো
- পুনর্নির্মিত রেলস্টেশন
- সড়ক উন্নয়ন
- স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণ
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
- নগর পরিকাঠামো উন্নয়ন
সরকারের দাবি, এই প্রকল্পগুলি উত্তর ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।
সবুজ জ্বালানির পথে ভারতের বড় পদক্ষেপ
হাইড্রোজেন ট্রেন চালুর মাধ্যমে ভারত জাতীয় গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন-এর লক্ষ্য পূরণের দিকে আরও এক ধাপ এগোল। জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহার বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের বহু অ-বৈদ্যুতিক ও পাহাড়ি রেলপথে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে।
চণ্ডীগড় ও পাঞ্জাবেও একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন
হরিয়ানার কর্মসূচির পর প্রধানমন্ত্রী চণ্ডীগড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সড়ক অবকাঠামো সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এরপর পাঞ্জাবের জলন্ধরে গিয়ে পুনর্নির্মিত রেলস্টেশন, রেল সংযোগ এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পও দেশের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন।
উপসংহার
দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের উদ্বোধন শুধু ভারতীয় রেলের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক নয়, বরং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে ভারতের দৃঢ় পদক্ষেপেরও পরিচয়। একই দিনে ১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নকে নতুন গতি দেবে। আগামী দিনে হাইড্রোজেন প্রযুক্তি ভারতীয় রেলের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

