নিজস্ব সংবাদদাতা: একটি ছোট্ট চিপ। আকারে হয়তো নখের চেয়েও ছোট। কিন্তু সেই চিপ ছাড়া আজকের পৃথিবী কার্যত অচল। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)—সব কিছুর প্রাণভোমরা এই সেমিকন্ডাক্টর চিপ। অথচ সেই চিপের বড় অংশই এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় ভারতকে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে সামান্য টান পড়লেই তার প্রভাব পড়ে দেশের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে।
এই প্রেক্ষাপটেই দেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে Semicon 2.0 কর্মসূচির অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। সরকারের লক্ষ্য শুধু নতুন চিপ কারখানা তৈরি নয়, বরং এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যাতে গবেষণা, ডিজাইন, কাঁচামাল, উৎপাদন সরঞ্জাম, দক্ষ কর্মী—সব কিছুই ধীরে ধীরে দেশের ভিতরেই তৈরি হয়।
ভারত ইতিমধ্যেই Semicon 1.0-এর মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের পথে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পে উৎপাদন শুরু হয়েছে, আবার কয়েকটি নির্মাণের পর্যায়ে রয়েছে। নতুন পর্যায়ে সেই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাইছে কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কারখানা বানালেই হবে না; একটি সফল সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা। নতুন নীতিতে সেই দিকগুলির উপরই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
এবারের নীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক, বিশেষ গ্যাস, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ উৎপাদন। এতদিন এই ক্ষেত্রগুলির জন্য বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর করতে হত। সরকারের আশা, নতুন প্রণোদনার ফলে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলিও এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে।
আরও একটি বড় দিক হল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে বিশ্বের একাধিক দেশ ও সংস্থা একসঙ্গে কাজ করে। সেই কারণেই বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থায়িত্বের বার্তা দিয়েছে কেন্দ্র। ভারতের দ্রুত বাড়তে থাকা ইলেকট্রনিক্স বাজারও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
তবে শুধু বিনিয়োগ এলেই হবে না। সেই প্রযুক্তি চালানোর জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, গবেষণাগার এবং শিল্পমুখী পাঠক্রম চালুর উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ভারত যদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চায়, তবে দক্ষ মানবসম্পদই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি।
India Electronics and Semiconductor Association (IESA)-এর সভাপতি অশোক চন্দক বলেন, Semicon 2.0-এর মূল উদ্দেশ্য হল প্রথম পর্যায়ে তৈরি হওয়া ভিতকে আরও শক্তিশালী করে একটি সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। তাঁর মতে, এতে দেশীয় উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানির উপর নির্ভরতাও ধীরে ধীরে কমবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুবিমল ভট্টাচার্য-এর মতে, নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হল কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ এবং উৎপাদন সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রেও সরকারি উৎসাহ। তাঁর কথায়, এর ফলে শুধু বড় কারখানাই নয়, গোটা শিল্প শৃঙ্খলই শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা Semicon India সম্মেলনে বিশ্বের বহু প্রযুক্তি সংস্থা অংশ নেওয়ার কথা। শিল্পমহলের একাংশের আশা, সেই সম্মেলন থেকেই ভারতে আরও নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পথ খুলে যেতে পারে।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর কী?
আজ যে স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা গাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই সেমিকন্ডাক্টর চিপ লাগে। দেশে এই শিল্প শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ কমতে পারে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও মজবুত হতে পারে। যদিও এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সময় লাগবে, তবু Semicon 2.0-কে সেই দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

