সংক্ষিপ্ত সারাংশ: কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর লোকসভার আসন সংখ্যা ৮৫০-এ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বলছেন শুধু সংখ্যাবৃদ্ধিতেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না, প্রয়োজন সংসদীয় নজরদারি ও বিতর্কের সংস্কৃতি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় স্পষ্ট করেছেন, ৫৪৩ থেকে ৮১৬ আসনের প্রস্তাবিত মডেলে দক্ষিণী রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমবে না, প্রতিটি রাজ্যের আসন ও অংশীদারিত্ব বরং বাড়বে, এবং এই প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের আগে কার্যকর হবে না
সম্পাদকীয় ডেস্ক: লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব ঘিরে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন কংগ্রেস সাংসদ তথা প্রখ্যাত লেখক শশী থারুর। তাঁর মতে, শুধু সাংসদের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয় — বরং প্রকৃত গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে সংসদের কার্যকারিতা এবং নির্বাহী বিভাগের উপর তার নজরদারির ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জনসংখ্যা বনাম প্রতিনিধিত্বের সমীকরণ
১৯৭৬ সাল থেকে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩-এ আটকে আছে, অথচ সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে একজন সাংসদকে এখন প্রতিনিধিত্ব করতে হয় আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই লোকসভার আসন বাড়ানোর যুক্তি উঠে আসছে, যাতে জনপ্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বজায় থাকে।
সংখ্যা বাড়লেও মানের প্রশ্নে উদ্বেগ
তবে থারুরের মূল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তাঁর মতে, শুধু সাংসদের সংখ্যা বাড়ানো হলেই সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি কার্যকর বা জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠবে না। বরং প্রকৃত গণতান্ত্রিক নজরদারির জন্য প্রয়োজন অধিবেশনের পর্যাপ্ত সময়, বিতর্কের সুযোগ এবং কমিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে গভীর পর্যালোচনার সংস্কৃতি — যা বর্তমানে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে বলে তিনি মনে করেন।
অধিবেশনের সময় কমছে, প্রশ্নোত্তর পর্বও সংক্ষিপ্ত হচ্ছে
সাম্প্রতিক দশকগুলিতে সংসদের অধিবেশন চলার দিনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিলগুলি প্রায়শই বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই দ্রুত পাশ হয়ে যাচ্ছে, আর মন্ত্রীদের জবাবদিহি করার মূল হাতিয়ার প্রশ্নোত্তর পর্বও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। থারুরের যুক্তি, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সাংসদের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যত প্রতীকী থেকে যাবে, বাস্তবে গণতন্ত্রের গুণগত মান বাড়বে না।
বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ
নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে আইনসভার সদস্যরা বছরের অনেকটা সময় ধরে অধিবেশনে অংশ নেন এবং নির্বাহী বিভাগের কাজকর্মের উপর নিয়মিত ও গভীর নজরদারি চালান। সেই তুলনায় ভারতের সংসদের কার্যক্রম অনেকটাই সংকুচিত, যেখানে আইনসভার সদস্যরা প্রকৃত পর্যালোচনার চেয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করাতেই বেশি সময় ব্যয় করেন বলে সমালোচনা রয়েছে।
দক্ষিণী রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অমিত শাহের ব্যাখ্যা
আসন বৃদ্ধির এই বিতর্কের মধ্যেই লোকসভায় ডিলিমিটেশন বিল, ২০২৬, সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট করেছেন, দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমে যাবে বলে যে ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে, তা ঠিক নয়। তাঁর দাবি, এই বিল দক্ষিণী রাজ্যগুলির ক্ষতি নয়, বরং লাভই করবে।
শাহ জানান, ৫০ শতাংশ আসন বৃদ্ধির প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী লোকসভার বর্তমান ৫৪৩টি আসন বেড়ে দাঁড়াবে ৮১৬-তে, আর দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির বর্তমান ১২৯টি আসন বেড়ে হবে ১৯৫টি — অর্থাৎ মোট আসনের অনুপাতে তাদের অংশীদারিত্ব প্রায় ২৪ শতাংশেই থাকবে, যা এখনও প্রায় একই। তাঁর মতে, ৮৫০ সংখ্যাটি একটি রাউন্ড-অফ করা ঊর্ধ্বসীমা মাত্র, প্রকৃত সংখ্যা হবে ৮১৬।
রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান পেশ করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সংসদে অমিত শাহ প্রতিটি দক্ষিণী রাজ্যের জন্য পৃথক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। কর্ণাটকের আসন ২৮ থেকে বেড়ে হবে ৪২, তবে মোট আসনের অনুপাতে অংশীদারিত্ব প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে (৫.১৫% থেকে ৫.১৪%)। অন্ধ্রপ্রদেশের আসন ২৫ থেকে বেড়ে হবে ৩৮, অংশীদারিত্ব বাড়বে ৪.৬০% থেকে ৪.৬৫%। তেলঙ্গানার আসন ১৭ থেকে বেড়ে হবে ২৬, অংশীদারিত্ব বাড়বে ৩.১৩% থেকে ৩.১৮%। তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি — ৩৯ থেকে বেড়ে হবে ৫৯টি আসন, অংশীদারিত্ব বাড়বে ৭.১৮% থেকে ৭.২৩%। কেরলের আসন ২০ থেকে বেড়ে হবে ৩০, অংশীদারিত্ব প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে (৩.৬৮% থেকে ৩.৬৭%)।
তামিলনাড়ুর মানুষকে আশ্বস্ত করে শাহ বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক শক্তি কমবে না, বরং বাড়বে।
লোকসভা আসন বৃদ্ধির প্রস্তাব: দক্ষিণী রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বের তুলনামূলক পরিসংখ্যান (৫০% বৃদ্ধি মডেল)
| রাজ্য | বর্তমান লোকসভা আসন (৫৪৩) | বর্তমান অংশীদারিত্ব | প্রস্তাবিত আসন (৮১৬) | প্রস্তাবিত অংশীদারিত্ব |
|---|---|---|---|---|
| কর্ণাটক | 28 | 5.15% | 42 | 5.14% |
| অন্ধ্রপ্রদেশ | 25 | 4.60% | 38 | 4.65% |
| তেলঙ্গানা | 17 | 3.13% | 26 | 3.18% |
| তামিলনাড়ু | 39 | 7.18% | 59 | 7.23% |
| কেরল | 20 | 3.68% | 30 | 3.67% |
| মোট (দক্ষিণী রাজ্য) | 129 | 23.76% (প্রায় 24%) | 195 | 23.87% (প্রায় 24%) |
লোকসভার সামগ্রিক আসন বৃদ্ধির প্রস্তাব
| বিষয় | বর্তমান | প্রস্তাবিত (৫০% বৃদ্ধি মডেল) |
|---|---|---|
| মোট লোকসভা আসন | 543 | 816 |
| দক্ষিণী রাজ্যগুলির মোট আসন | 129 | 195 |
| দক্ষিণী রাজ্যগুলির মোট অংশীদারিত্ব | 23.76% | 23.87% |
| কার্যকর হওয়ার সম্ভাব্য সময় | বর্তমান ব্যবস্থা বহাল | ২০২৯ সালের আগে নয় (সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী) |
উৎস: কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের লোকসভায় দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী উপস্থাপিত প্রস্তাবিত পরিসংখ্যান।
২০২৯ সালের আগে কার্যকর হবে না, স্পষ্ট করলেন শাহ
এই বিল নিয়ে অন্যতম বড় উদ্বেগ ছিল তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে কিনা। এই প্রসঙ্গে অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ডিলিমিটেশন কমিশনের রিপোর্ট সংসদে অনুমোদিত হয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পরই তা কার্যকর হবে, এবং ২০২৯ সালের আগে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তিনি নিশ্চিত করেন, ২০২৯ সাল পর্যন্ত সমস্ত নির্বাচন বর্তমান আসন সংখ্যা ও পদ্ধতি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।
জাতিগত জনগণনা প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা
এই আলোচনায় জাতিগত জনগণনা প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, জনগণনা দুটি ধাপে হয় — প্রথমে বাড়ি গণনা, তারপর ব্যক্তি গণনা। বর্তমানে প্রথম ধাপ চলছে, যেখানে বাড়ি গণনা করা হচ্ছে, আর যেহেতু বাড়ির কোনও জাতি হয় না, তাই এই পর্যায়ের ফর্মে জাতি সংক্রান্ত কোনও কলাম নেই। ব্যক্তি গণনার পর্যায়ে জাতিগত তথ্য সংগ্রহ করা হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
উপসংহার
শশী থারুরের বিশ্লেষণ এবং অমিত শাহের সরকারি ব্যাখ্যা — দুটি মিলিয়ে লোকসভা আসন বৃদ্ধি ইস্যুতে একটি সম্পূর্ণ চিত্র উঠে আসছে। সরকার পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে দক্ষিণী রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমবে না, বরং বাড়বে, এবং এই প্রক্রিয়া ২০২৯ সালের আগে কার্যকর হবে না। তবে থারুরের মতো বিশ্লেষকদের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — শুধু আসন সংখ্যা বাড়ালেই কি গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, নাকি সংসদীয় বিতর্ক, কমিটি পর্যালোচনা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিও সমান গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে? এই বিতর্ক আগামী দিনেও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মহলে চর্চার কেন্দ্রে থাকবে।

