শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের শর্তে অস্ট্রেলিয়া থেকে দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম আমদানির পথ খুলে গেল ভারতের সামনে। তৃতীয় ভারত-অস্ট্রেলিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ়ির মধ্যে প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনার পরে এই ঘোষণা করা হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা— সব ক্ষেত্রেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ। এই বৈঠকের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হল এখানে।
ইউরেনিয়াম রফতানি চূড়ান্ত: আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তাবিধি মেনে এবং সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের শর্তে ভারতে দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম রফতানির প্রশাসনিক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে দুই দেশ। নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতের সদস্যপদের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থনও ফের জানানো হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান: সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও হিংসাত্মক উগ্রপন্থার নিন্দা জানিয়েছেন দুই নেতা। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁও এবং সিডনির বন্ডাই সৈকতে হামলার প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।
প্রতিরক্ষায় নতুন ঘোষণাপত্র: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী, যা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন গভীরতা দেবে। বার্ষিক প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ চালু করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তায় জোর: শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিকের লক্ষ্যে সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। অস্ট্রেলিয়ার মেরিটাইম বর্ডার কমান্ড এবং ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একটি সমঝোতাপত্রও সাক্ষরিত হয়েছে।
সামরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়: ২০২৮-২৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা কলেজে ভারতীয় সামরিক প্রশিক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জেনারেল রাওয়াত ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া ইয়াং অফিসার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের চতুর্থ পর্বও আয়োজন করবে অস্ট্রেলিয়া।
বাণিজ্য চুক্তিতে গতি: বিদ্যমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি (ইসিটিএ)-র অধীনে বাণিজ্য বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি (সিইসিএ) দ্রুত সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ফিউচার মেড ইন অস্ট্রেলিয়া’-র মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশে সহযোগিতা: নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা গভীর করার অঙ্গীকার করেছে দুই দেশ। সাইবার, প্রযুক্তি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে একটি নতুন অংশীদারি চুক্তি (প্যাক্টস)-এও সম্মত হয়েছে তারা। ভারতের গগনযান মানব মহাকাশ অভিযানে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কোকোস কিলিং দ্বীপপুঞ্জে একটি অস্থায়ী মহাকাশ ট্র্যাকিং কেন্দ্র স্থাপনও।
প্রবাসী ভারতীয়দের ভূমিকা: অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশে জন্ম নেওয়া বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এখন ভারতীয়রাই। এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে অস্ট্রেলিয়া-ভারত সম্পর্ক কেন্দ্রের মৈত্রী অনুদান খাতে এক কোটি ডলার বরাদ্দের ঘোষণাও করা হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ: বেঙ্গালুরুতে ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুগ্রামে ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের অনুমোদন স্বাগত জানানো হয়েছে। ওড়িশার ভুবনেশ্বরে খনি শিল্পে দক্ষতা উন্নয়নের একটি জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনেও সহমত হয়েছে দুই দেশ।
রাষ্ট্রসংঘ সংস্কারে সমর্থন: রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা ফের তুলে ধরেছেন দুই নেতা। সংস্কারিত নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। পাশাপাশি, ২০২৮-২৯ মেয়াদে ভারত এবং ২০২৯-৩০ মেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার অস্থায়ী সদস্যপদ প্রার্থিতার প্রতি পারস্পরিক সমর্থনের কথাও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
বারো বছরের অপেক্ষার অবসান
২০১৪ সালেই ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একটি পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু তারপর কেটে গিয়েছে বারো বছর, অথচ সেই চুক্তির আওতায় এক গ্রাম ইউরেনিয়ামও ভারতে আসেনি। এই দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তিটি কার্যত ঝুলে ছিল, আর ভারত তার পরমাণু জ্বালানির চাহিদা মেটাতে নির্ভর করে এসেছে রাশিয়ার রোসাটমের উপরেই। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক হরমুজ প্রণালী সঙ্কটই দুই দেশকে এই দীর্ঘদিনের স্থগিত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
বিশ্বের মোট ইউরেনিয়াম মজুতের প্রায় ২৮ শতাংশই রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। অন্যদিকে ভারতকে তার পরমাণু জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হয়, কারণ দেশীয় ইউরেনিয়াম আকরিকের মান অত্যন্ত নিম্ন— মাত্র ০.০২ থেকে ০.৪৫ শতাংশ, যেখানে কানাডার আকরিকের মান প্রায় ১৫ শতাংশ। এত নিম্নমানের আকরিক থেকে ইউরেনিয়াম নিষ্কাশনের খরচ আমদানির চেয়েও বেশি পড়ে বলেই ভারতকে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির পথে হাঁটতে হয়।
পরমাণু বিদ্যুতে ভারতের বড় লক্ষ্যমাত্রা
বর্তমানে ভারতের মোট পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮.৮৮ গিগাওয়াট। ২০৪৭ সালের মধ্যে এই ক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে সরকার। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ৩.৫ থেকে ৪ গিগাওয়াট নতুন ক্ষমতা যোগ করতে হবে, যা বর্তমান নির্মাণ গতির প্রায় দশ গুণ।
এই লক্ষ্যপূরণে ইউরেনিয়ামের বার্ষিক চাহিদাও বহু গুণ বাড়বে— বর্তমান ১৫০০ টন থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৪০০ টনে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতেই গত ছয় মাসে একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি সেরে ফেলেছে ভারত। কানাডার ক্যামেকোর সঙ্গে ১০ হাজার টন ইউরেনিয়ামের জন্য ২৬০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে, কাজাখস্তানের কাজ়াতমপ্রমের সঙ্গেও পৃথক একটি চুক্তি হয়েছে, আর এবার যুক্ত হল অস্ট্রেলিয়াও। তিনটি ভিন্ন মহাদেশ থেকে জ্বালানি সরবরাহের বন্দোবস্ত আগেভাগেই পাকা করে রাখার এই কৌশল ভবিষ্যতে জ্বালানি সঙ্কটে আটকে পড়া এড়াতেই সাহায্য করবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
কৃত্রিম মেধা ও ডেটা সেন্টারের সঙ্গে যোগসূত্র
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোই নয়, এই কৌশলের পিছনে রয়েছে ভারতের আরও একটি বড় পরিকল্পনা— বিশ্বের কৃত্রিম মেধা ও ডেটা সেন্টার শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠা। এই ধরনের পরিকাঠামো চব্বিশ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দাবি করে, যা সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের পক্ষে একা দেওয়া সম্ভব নয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে তা সম্ভব হলেও, নেট জ়িরো লক্ষ্যপূরণের প্রতিশ্রুতির কারণে সেই পথে খুব বেশি দূর যাওয়ার সুযোগ নেই ভারতের সামনে। ফলে চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ক্ষেত্রে পরমাণু বিদ্যুৎই একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠছে।
এই লক্ষ্যেই ২০ হাজার কোটি টাকার পরমাণু জ্বালানি মিশনের আওতায় ২০৩৩ সালের মধ্যে পাঁচটি ছোট মডিউলার চুল্লি (এসএমআর) তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার ইউরেনিয়াম হাতে আসা শুধু জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি ভারতের কৃত্রিম মেধা পরিকাঠামোকে সচল রাখার প্রস্তুতিও বটে— কারণ বিদ্যুৎ ছাড়া সার্ভার চলে না, আর সার্ভার ছাড়া কৃত্রিম মেধার পরিকাঠামোও অচল।
এসির চাহিদা বৃদ্ধি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারতের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার প্রয়োজনেও আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা অর্থনীতিবিদদের। একটি দেশের অর্থনীতি প্রকৃতপক্ষে কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা মাপার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবেও বিদ্যুতের চাহিদাকে গণ্য করা হয়— কারণ শক্তিশালী অর্থনীতিই একটি দেশকে বিনা বাধায় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতা জোগায়।
দুই নেতার বার্তা
সম্মেলনের ফাঁকে আলবানিজ়ি জানান, ব্যবসায়ী নেতৃত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে মিলে ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার কাজ চালিয়ে যাবে তাঁর সরকার। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কই ব্যবসায়িক সাফল্যের অনেক গল্পের ভিত্তি তৈরি করেছে।
সফরকালে প্রাক্তন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন মোদী এবং দুই দেশের বন্ধুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। অস্ট্রেলিয়া-ভারত সিইও ফোরামে যৌথভাবে ভাষণ দেওয়ার সময়ে মোদী জানান, ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, নীতিগত সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সম্প্রসারিত উদ্ভাবন বাস্তুতন্ত্র অস্ট্রেলীয় সংস্থাগুলির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে ভারতকে তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারতের বিশালতা এবং অস্ট্রেলিয়ার দক্ষতার মেলবন্ধন দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে। ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বানও জানান তিনি।

