জল কি হয়ে উঠতে পারে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক অস্ত্র? তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর চিনের বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা ঘিরে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে। ভারতে প্রবেশ করে এই নদীই পরিচিত ব্রহ্মপুত্র নামে, আর তাই এই প্রকল্প নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ মোটেই অমূলক নয়।
আসলে কতটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব চিনের পক্ষে
জলবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে ব্রহ্মপুত্রের গোটা প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া চিনের পক্ষে সম্ভব নয়। এর কারণ নদীর জলের একটা বড় অংশ আসে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢোকার পরে বিভিন্ন উপনদী এবং বর্ষার বৃষ্টির মাধ্যমে। ফলে বর্ষাকালে শুধু উজানের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে গোটা নদীর প্রবাহ থামিয়ে দেওয়া কার্যত অবাস্তব একটি ধারণা।
তবে সমস্যাটা পুরোপুরি অন্য জায়গায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চিন নদীর জল সম্পূর্ণ বন্ধ না করলেও প্রবাহের সময় এবং পরিমাণে কারসাজি করতে পারে। শুষ্ক মরসুমে জল আটকে রাখা কিংবা হঠাৎ করে অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অতীতের তেতো অভিজ্ঞতা
জলসংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান নিয়ে ভারত-চিন সম্পর্কে অতীতেও তিক্ততা তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালে ডোকলাম নিয়ে দুই দেশের সংঘাতের সময় বন্যা সংক্রান্ত তথ্য ভাগ না করার অভিযোগ উঠেছিল বেজিংয়ের বিরুদ্ধে, যার জেরে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিভিন্ন রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলে জলসংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানও কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
সময়মতো নদীর প্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য না পাওয়া গেলে নিম্ন অববাহিকার দেশগুলির আগাম বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না বলে মনে করছেন জল-সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
বেজিংয়ের সাফাই, দিল্লির সংশয়
চিনের দাবি, ইয়ারলুং সাংপোর উপর এই প্রকল্প মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যেই তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পটি ভারতীয় সীমান্তের এত কাছাকাছি হওয়ায় নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলের সংশয় দূর হচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিশাল জলকাঠামো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করতে পারে, যা নিছক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা ছাড়িয়ে কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতও
চিনের এই উদ্যোগের পাল্টা হিসেবে ভারতও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নিজস্ব পরিকাঠামো, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নদী ব্যবস্থাপনা জোরদার করার কাজে হাত দিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াও চলছে সমান তালে।
জল এখন নিছক পরিবেশের প্রশ্ন নয়
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, আগামী দিনে জল শুধু একটি পরিবেশগত বিষয় হয়ে থাকবে না— তা হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নদী, বন্দর, জ্বালানি সরবরাহ পথ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ— এই সবকিছুই এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে ভারত-চিনের এই টানাপোড়েনকে শুধু একটি নদীর জলের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এশিয়ার আগামী দিনের কৌশলগত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে।

