আমেরিকায় পড়াশোনা বা কর্মজীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা ভারতীয়দের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে নতুন এক বাধার পাহাড়। H-1B ভিসা এবং স্টুডেন্ট ভিসা— দুই ক্ষেত্রেই নিয়ম আরও কঠোর করার পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই নতুন নীতিগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসতে পারে বলে খবর।
এক মাস আগেই ধাক্কা খেয়েছিল ১ লক্ষ ডলারের ফি
ঠিক এক মাস আগে মার্কিন আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছিল, যেখানে এইচ-১বি ভিসার জন্য এক লক্ষ ডলার ফি ধার্য করা হয়েছিল। তবে এই আইনি ধাক্কার পরেও ভিসা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে কোনও নরমভাব আসেনি। বরং একাধিক মার্কিন সরকারি দফতর মিলে H-1B এবং স্টুডেন্ট ভিসা— দুটোতেই লাগাম টানার নতুন পরিকল্পনা তৈরি করছে বলে জানা যাচ্ছে।
এইচ-১বি ভিসায় কী কী পরিবর্তনের ইঙ্গিত
বর্তমানে বছরে সর্বোচ্চ ৮৫ হাজার H-1B ভিসা লটারির মাধ্যমে দেওয়া হয়। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লটারির শর্ত থেকে ছাড় রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনা, সেই ছাড়ের রাস্তাটিও বন্ধ করে দেওয়া।
আরেকটি প্রস্তাব হল, H-1B ভিসাকে এমনভাবে ব্যয়বহুল করে তোলা, যাতে তা নিয়োগকারী সংস্থার কাছে অলাভজনক হয়ে ওঠে। আদালতে খারিজ হওয়া এক লক্ষ ডলারের ফি ছিল এই কৌশলেরই একটি উদাহরণ। এই ফি বাতিল হলেও বায়োমেট্রিক এন্ট্রি-এক্সিট ফি এবং বার্ষিক অনুসন্ধান মাশুলের মতো নতুন এককালীন খরচ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের, যা সরাসরি নিয়োগকারী সংস্থার উপরেই বর্তাবে।
তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ন্যূনতম বেতন ২১ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও বিবেচনাধীন। এর পিছনে যুক্তি, বিদেশি কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে দিলে সংস্থাগুলি তাদের নিয়োগে আর আগ্রহী হবে না। তবে এই যুক্তির স্বপক্ষে মার্কিন সরকারের কোনও তথ্যভিত্তিক গবেষণা নেই বলেই অভিযোগ। বরং বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ মূলত তাঁদের বিশেষ দক্ষতার কারণেই হয়ে থাকে, শুধু কম বেতনের জন্য নয়।
এইচ-১বি অপব্যবহার রুখতে তদন্তের প্রস্তুতি
মার্কিন শ্রম দফতর জানিয়েছে, H-1B ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হতে পারে। এই তালিকায় রয়েছে ভারতীয় প্রযুক্তি সংস্থা কগনিজেন্টের নামও। সব মিলিয়ে সরকারের হাতে থাকা সমস্ত উপায় ব্যবহার করে H-1B ভিসার সংখ্যা কঠোরভাবে সীমিত করাই লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
ছাড় পাচ্ছেন না পড়ুয়ারাও
শুধু কর্মরত পেশাদারেরাই নন, ভিসা কড়াকড়ির আঁচ পড়তে চলেছে ছাত্রছাত্রীদের উপরেও। এতদিন ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং’ বা ওপিটি প্রকল্পের মাধ্যমে পড়ুয়ারা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মঅভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেতেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিভাগের পড়ুয়াদের জন্য এই মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোরও সুযোগ ছিল। এখন প্রশাসনের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে পড়ুয়াদের জন্য পৃথক ভিসা সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা, যা কার্যত প্রশিক্ষণে উৎসাহ কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ভারতীয়দের উপরেই
এই সম্ভাব্য কড়াকড়ির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে চলেছে ভারতীয়দের উপরেই। ২০২৪ সালের হিসেব অনুযায়ী, মোট H-1B ভিসাধারীদের মধ্যে ৭১ শতাংশই ভারতীয় নাগরিক। একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আমেরিকায় পড়তে যাওয়া বিদেশি পড়ুয়াদের মধ্যে ৩১ শতাংশই ছিলেন ভারতীয়। অর্থাৎ, নতুন এই নিয়মকানুন কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভারতীয় পড়ুয়া এবং পেশাদারকেই তার প্রভাব সামলাতে হতে পারে।
যাঁরা এখনও আমেরিকায় পড়াশোনা বা কর্মজীবনের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার এখনই সময় বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

