বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহিনী হিসেবে আবারও স্বীকৃতি পেল ভারতীয় বায়ুসেনা (IAF)। আন্তর্জাতিক সামরিক বিমান শক্তি মূল্যায়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ডিরেক্টরি অফ মডার্ন মিলিটারি এয়ারক্র্যাফট (WDMMA)-এর ২০২৬ সালের তালিকায় বিশ্বের তৃতীয় শক্তিশালী বিমানবাহিনী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখল ভারত। টানা পঞ্চম বছর চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সকে (PLAAF) পিছনে রেখে এই অবস্থান বজায় রেখেছে ভারত।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেও রয়েছে একাধিক সতর্কবার্তা। আধুনিকীকরণ, যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের ঘাটতি এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধ প্রস্তুতি— সবকিছু মিলিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনার সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
কীভাবে হয় মূল্যায়ন
১০৩টি দেশের ১২৯টি বিমানবাহিনী এবং ৪৮ হাজারেরও বেশি সামরিক বিমান বিশ্লেষণ করে এই বার্ষিক তালিকা তৈরি করে ওয়ার্ল্ড ডিরেক্টরি অফ মডার্ন মিলিটারি এয়ারক্র্যাফট (WDMMA)। শুধু যুদ্ধবিমানের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে নয়, বরং সংস্থাটির নিজস্ব ‘ট্রু ভ্যালু রেটিং’ পদ্ধতিতে বিমানবহরের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা, আধুনিকীকরণের মাত্রা এবং সামগ্রিক অপারেশনাল সক্ষমতা— সব কিছুই বিবেচনায় রাখা হয় এই মূল্যায়নে। জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আকাশে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পরিবহণ বিমান, প্রশিক্ষণ বিমান এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী প্ল্যাটফর্মের মতো বিশেষায়িত বিমানকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় এই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে।
আমেরিকা ও রাশিয়ার পরেই ভারত
ডব্লিউডিএমএমএ-র মূল্যায়নে বিশ্বের প্রথম স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। দ্বিতীয় স্থানে রাশিয়া এবং তৃতীয় স্থানে ভারত। চতুর্থ স্থানে রয়েছে চিন।
এই মূল্যায়ন শুধুমাত্র যুদ্ধবিমানের সংখ্যা দেখে করা হয় না। বিমানবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতা, প্রযুক্তিগত আধুনিকতা, অপারেশনাল প্রস্তুতি, রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা, বিশেষ মিশনের সক্ষমতা এবং বিমানবহরের বৈচিত্র্য— সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় এই র্যাঙ্কিং।
বিশ্বের ১০০-রও বেশি দেশের ৪৮ হাজারেরও বেশি সামরিক বিমান বিশ্লেষণ করে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
কত বড় ভারতের বিমানবহর?
বর্তমানে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে রয়েছে প্রায় ১,৭১৬টি বিমান।
এর মধ্যে রয়েছে—
- ৫৪২টি যুদ্ধবিমান
- ৪৯৮টি হেলিকপ্টার
- ২৮২টি পরিবহণ বিমান
- ৩৭৪টি প্রশিক্ষণ বিমান
- ২০টি বিশেষ মিশনের বিমান (AWACS, ISR, এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলার)
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সংখ্যার বিচারে নয়, বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার সক্ষমতাই ভারতকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর বিমানবাহিনীতে পরিণত করেছে।
সাফল্যের আড়ালে বড় সমস্যা
র্যাঙ্কিংয়ে তৃতীয় স্থান ধরে রাখলেও বায়ুসেনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের সংখ্যা।
বর্তমানে আইএএফ-এর হাতে রয়েছে মাত্র ২৯টি সক্রিয় ফাইটার স্কোয়াড্রন। অথচ চিন ও পাকিস্তান— দুই ফ্রন্টে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার জন্য অনুমোদিত সংখ্যা ৪২টি স্কোয়াড্রন।
অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিরক্ষা মহলের মতে, আগামী এক দশকে পুরনো মিগ-২৯, জাগুয়ার ও মিরাজ-২০০০ ধাপে ধাপে অবসর নিলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
ভরসার নাম তেজস
এই ঘাটতি পূরণে সবচেয়ে বড় আশা দেশীয় যুদ্ধবিমান তেজস।
দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পর বর্তমানে তেজস মার্ক-১এ সংস্করণকে বায়ুসেনার মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকার ইতিমধ্যেই—
- ৮৩টি তেজস মার্ক-১এ
- ১০টি প্রশিক্ষণ সংস্করণ
- অতিরিক্ত ৯৭টি তেজস
অর্ডার করেছে।
সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে ১৮০টি তেজস ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে পৌঁছানোর কথা।
আধুনিক AESA রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা তেজসকে চতুর্থ-প্রজন্মের উন্নত যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য এএমসিএ
তেজসের পর ভারতের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট (AMCA)।
এটি হবে ভারতের প্রথম পঞ্চম-প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান।
প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে এএমসিএ উৎপাদন শুরু হতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষ্য ৯৬টি এএমসিএ বিমান বায়ুসেনায় অন্তর্ভুক্ত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এএমসিএ সফল হলে ভারত বিশ্বের সেই সীমিত কয়েকটি দেশের তালিকায় যোগ দেবে, যারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে পঞ্চম-প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করতে সক্ষম।
রাফালেও নজর
দেশীয় প্রকল্পের পাশাপাশি বিদেশি প্ল্যাটফর্ম কেনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই বিমানগুলি ভবিষ্যতে অবসর নিতে চলা পুরনো বহরের বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
দুর্ঘটনার দীর্ঘ ছায়া
ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ দীর্ঘদিনের দুর্ঘটনা সমস্যা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দশকে দুর্ঘটনায় হারিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি সামরিক বিমান। প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারের বেশি পাইলট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু পুরনো প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘদিন ব্যবহার করার ফলে এই ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব বায়ুসেনার শক্তির উপর পড়েছে।
শক্তির সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব
বিশ্বের তৃতীয় শক্তিশালী বিমানবাহিনী হিসেবে ভারতের অবস্থান নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্য। তবে র্যাঙ্কিংয়ের বাইরে বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়।
চিন দ্রুতগতিতে পঞ্চম-প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বাড়াচ্ছে, পাকিস্তান নতুন প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করছে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে তেজস, এএমসিএ, রাফাল এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি আরও বাড়ানোর পথে হাঁটছে ভারতীয় বায়ুসেনা। আগামী দশকেই স্পষ্ট হবে, বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের তৃতীয় স্থান ধরে রাখার পাশাপাশি ভারত কতটা সফলভাবে আকাশযুদ্ধের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারে।

