জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) ২০২০ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করে তুলেছে বলে দাবি করলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিংহ। ডোডা গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের এক সম্মেলনে তিনি বলেন, নতুন শিক্ষা নীতির ফলে ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরাও এখন মেট্রো শহরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান তালে প্রতিযোগিতা করতে পারছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির প্রসারেও NEP গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নয়াদিল্লি: জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) ২০২০ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এবং এর ফলে ডোডার মতো দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরের ছাত্রছাত্রীরাও এখন দেশের বড় মেট্রো শহরগুলির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী (স্বতন্ত্র দায়িত্ব) ড. জিতেন্দ্র সিংহ।
শনিবার জম্মু ও কাশ্মীরের গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ, ডোডা আয়োজিত দু’দিনব্যাপী হাইব্রিড সম্মেলনে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, NEP ২০২০ শিক্ষাকে শুধুমাত্র ডিগ্রিকেন্দ্রিক না রেখে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার দিকে নিয়ে গেছে।
সম্মেলনের বিষয় ছিল— “জম্মু ও কাশ্মীরে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর বাস্তবায়ন: অন্তর্ভুক্তি, সমতা ও প্রবেশাধিকারের চ্যালেঞ্জ”।
শিক্ষার নতুন দর্শন
ড. সিংহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট বিষয় পড়তে বাধ্য করা হতো। কিন্তু NEP ২০২০ সেই কাঠামো ভেঙে শিক্ষার্থীদের নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে।
তাঁর মতে, বর্তমান যুগে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। বরং দক্ষতা, সৃজনশীলতা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনই আগামী দিনের কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরি করবে।
“একটি ডিগ্রি আর শুধুমাত্র প্রদর্শনের বস্তু নয়, আর চাকরি মানেই শুধু সরকারি চাকরি নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।
ডোডার শিক্ষা ঐতিহ্যের প্রশংসা
ডোডা গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজকে অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন জিতেন্দ্র সিংহ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ডোডা ও ভদ্রওয়াহে আসতে হতো।
তাঁর মতে, সমৃদ্ধ শিক্ষাগত ঐতিহ্য এবং ক্রমবর্ধমান পরিকাঠামোর ভিত্তিতে ডোডা ভবিষ্যতে উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
স্টার্টআপ বিপ্লবে এগিয়ে ছোট শহর
ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের দ্রুত বিকাশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে দেশে যেখানে স্টার্টআপের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০-এর কাছাকাছি, বর্তমানে তা বেড়ে ২.৩ লক্ষেরও বেশি হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের মোট স্টার্টআপের অর্ধেকেরও বেশি এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরগুলি থেকে উঠে আসছে। এর ফলে স্পষ্ট যে উদ্ভাবন আর শুধুমাত্র দিল্লি, মুম্বই বা বেঙ্গালুরুর মতো মহানগরকেন্দ্রিক নয়।
‘ল্যাভেন্ডার রেভলিউশন’-এর উদাহরণ
ডোডা ও ভদ্রওয়াহ অঞ্চলে CSIR-এর অ্যারোমা মিশনের অধীনে শুরু হওয়া ‘ল্যাভেন্ডার রেভলিউশন’-এর সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন জিতেন্দ্র সিংহ।
তিনি বলেন, একসময় সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া ল্যাভেন্ডার চাষ আজ জম্মু-কাশ্মীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং অন্যান্য হিমালয়ান রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে এবং বহু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না; কৃষি, সুগন্ধি ফসল এবং স্থানীয় সম্পদকেও কাজে লাগিয়ে সফল ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।
‘হিমালয়ান স্টার্টআপ হাব’ হতে পারে ডোডা
ডোডাকে একটি সম্ভাবনাময় ‘হিমালয়ান স্টার্টআপ ও ইনোভেশন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
তিনি প্রস্তাব দেন, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, অ্যারোমা শিল্প, ভেষজ পণ্য এবং AYUSH-ভিত্তিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, পর্যটন এবং গ্রামীণ শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
প্রযুক্তি দূর করেছে ভৌগোলিক বাধা
ডিজিটাল সংযোগ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর কথায়, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আজ দূরবর্তী এলাকার তরুণরাও দেশের সেরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে। এর ফলে প্রতিভা আর ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকছে না।
২০৪৭-এর ভারতের জন্য প্রস্তুতি
বক্তৃতার শেষে ড. জিতেন্দ্র সিংহ বলেন, বর্তমানে যারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, তারাই ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষে ভারতের নেতৃত্ব দেবে।
তিনি শিক্ষকদের আহ্বান জানান, শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং জাতি নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে।
উপসংহার
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগে ভারতের মানবসম্পদই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। NEP ২০২০-এর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা সফল হলে ভারতের ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। ডোডাকে ঘিরে জিতেন্দ্র সিংহের বার্তা সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করে।

