টোকিওর মেট্রোপলিটন জিমনেসিয়ামে রবিবার এক স্মরণীয় বিকেলের সাক্ষী থাকল ভারতীয় ব্যাডমিন্টন। দুইবারের অলিম্পিক পদকজয়ী পিভি সিন্ধু জাপান ওপেন ২০২৬-এর মহিলা সিঙ্গলস ফাইনালে হারালেন স্বাগতিক তারকা তথা তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আকানে ইয়ামাগুচিকে। ফলাফল ছিল একপেশে — ২১-১৭, ২১-১৭ — এবং এর মধ্য দিয়েই ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও শাটলার এই মর্যাদাপূর্ণ বিডব্লিউএফ সুপার ৭৫০ খেতাব ঘরে তুললেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বর্তমানে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১২ নম্বরে থাকা সিন্ধু এদিন হারালেন তৃতীয় বাছাই ইয়ামাগুচিকে, যিনি তাঁর নিজের দেশের মাটিতেই খেলছিলেন দর্শকদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে। প্রায় ৫০ মিনিটের লড়াইয়ে সিন্ধুর আক্রমণাত্মক গেম প্ল্যানের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি জাপানি তারকা।
প্রথম গেমে শুরুতেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যান সিন্ধু, কিন্তু কয়েকটি অহেতুক ভুলের সুযোগ নিয়ে সমতা ফেরান ইয়ামাগুচি। এরপর নেট প্লে-তে দক্ষতা দেখিয়ে ফের লিড নেন সিন্ধু, যদিও মাঝপথে ইয়ামাগুচি ১১-৯ ব্যবধানে এগিয়ে যান। বিরতির পর সিন্ধু এক দীর্ঘ র্যালি জিতে স্কোর ১১-১১ করেন, তারপর আক্রমণাত্মক খেলায় ১৬-১২ ব্যবধানে এগিয়ে যান। ইয়ামাগুচি সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও শেষ পাঁচ পয়েন্টের মধ্যে চারটি জিতে প্রথম গেম নিজের করে নেন সিন্ধু। দ্বিতীয় গেমে শুরু থেকেই দাপট দেখান তিনি, ৮-৩ ব্যবধানে এগিয়ে যান। ইয়ামাগুচি ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও সিন্ধুর পরপর স্ম্যাশের সামনে টিকতে পারেননি। শেষ দিকে কিছু ভুলের সুযোগে ইয়ামাগুচি ব্যবধান কমালেও, স্নায়ুচাপ ধরে রেখে চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট আদায় করেন সিন্ধু, এবং ইয়ামাগুচির শেষ রিটার্ন কোর্টের বাইরে গেলেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়।

শুধু ফাইনাল নয়, গোটা টুর্নামেন্ট জুড়েই দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন সিন্ধু। প্রথম রাউন্ডে মালয়েশিয়ার ওং এলসি-কে সহজেই হারান তিনি দুই সেটে, ২১-১৪ ও ২১-১১ ব্যবধানে। দ্বিতীয় রাউন্ডে পঞ্চম বাছাই চিনের হান ইউয়ে-কেও কোনও সুযোগ না দিয়ে হারান সিন্ধু, ২১-১৬ ও ২১-১৪ স্কোরলাইনে। কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের নোজোমি ওকুহারা চোটের কারণে ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ানোয় ওয়াকওভারে পরের রাউন্ডে পৌঁছন তিনি। সেমিফাইনালে চিনের প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন চেন ইউফেইয়ের বিরুদ্ধে প্রথম গেমে জমজমাট লড়াইয়ের পর ২১-১৯ ব্যবধানে জেতেন সিন্ধু, এবং দ্বিতীয় গেমে ১৫-১০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে অবসর নেন চেন, ফলে ফাইনালে পৌঁছে যান সিন্ধু। এই জয়ের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন জাপান ওপেনের ফাইনালে ওঠা প্রথম ভারতীয় মহিলা শাটলার।
এই জয় সিন্ধুর কেরিয়ারে একাধিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি তাঁর প্রথম জাপান ওপেন খেতাব, এবং তিনিই এই টুর্নামেন্ট জয়ী প্রথম ভারতীয় শাটলার। এটি তাঁর কেরিয়ারের প্রথম বিডব্লিউএফ সুপার ৭৫০ খেতাবও বটে। বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুরে এটি তাঁর ষষ্ঠ খেতাব, এবং ২০১৮ সালের আগে তিনি জিতেছিলেন তিনটি সুপারসিরিজ শিরোপাও। প্রায় ১৯ মাস (কারও কারও হিসেবে দুই বছরেরও বেশি) কোনও শিরোপা ছাড়াই কাটানোর পর এটি তাঁর প্রথম বড় জয়। এর আগে সিন্ধুর সর্বশেষ ট্যুর খেতাব ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৈয়দ মোদী ইন্টারন্যাশনালে, এবং ভারতের বাইরে এটি তাঁর প্রথম খেতাব ২০২২ সালের সিঙ্গাপুর ওপেনের পর থেকে। ২০১৯ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পিভি সিন্ধু জাপান ওপেন ২০২৬ চ্যাম্পিয়ন — প্রথম ভারতীয় হিসেবে ঐতিহাসিক জয়
- টোকিওয় ফাইনালে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও স্বাগতিক তারকা আকানে ইয়ামাগুচিকে ২১-১৭, ২১-১৭ ব্যবধানে হারান পিভি সিন্ধু।
- এই জয়ের মাধ্যমে তিনি জাপান ওপেন খেতাব জয়ী প্রথম ভারতীয় শাটলার, এবং এটি তাঁর কেরিয়ারের প্রথম বিডব্লিউএফ সুপার ৭৫০ খেতাব।
- ১৯ মাসের শিরোপা-খরা কাটিয়ে এই জয় — শেষ ট্যুর খেতাব ছিল ডিসেম্বর ২০২৪-এ সৈয়দ মোদী ইন্টারন্যাশনালে।
- গোটা টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে খেতাব জেতেন সিন্ধু — প্রথম রাউন্ডে ওং এলসি, দ্বিতীয় রাউন্ডে হান ইউয়ে, কোয়ার্টারে ওকুহারার ওয়াকওভার, সেমিফাইনালে চেন ইউফেইকে (চোটের কারণে অবসর) হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছন।
- বিপরীতে, লক্ষ্য সেন, আয়ুষ শেট্টি, উন্নতি হুডা, সাত্ত্বিক-চিরাগ সহ বাকি ভারতীয় শাটলাররা প্রথম বা দ্বিতীয় রাউন্ডেই ছিটকে যান — সিন্ধুই ছিলেন এবারের টুর্নামেন্টে ভারতের একমাত্র উজ্জ্বল মুখ।
- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সহ একাধিক নেতা সিন্ধুকে অভিনন্দন জানান।
- আগেই দুটি অলিম্পিক পদক (রুপো ২০১৬, ব্রোঞ্জ ২০২০), বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা (২০১৯) সহ পাঁচটি পদক জেতা সিন্ধুর কেরিয়ারে এই জয় একটি বড় শূন্যস্থান পূরণ করল, আসন্ন অলিম্পিকের আগে।
সিন্ধুর এই জয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, এবারের জাপান ওপেনে বাকি ভারতীয় শাটলারদের পারফরম্যান্স ছিল রীতিমতো হতাশাজনক। লক্ষ্য সেন প্রথম রাউন্ডেই জাপানের কোকি ওয়াতানাবের কাছে সরাসরি সেটে হেরে ছিটকে যান। আয়ুষ শেট্টিও তৃতীয় সেটে হার মানেন থাইল্যান্ডের দ্বিতীয় বাছাইয়ের কাছে, প্রথম গেম হারলেও দ্বিতীয় গেমে লড়াই করে জেতার পর তৃতীয় গেমে ছন্দ হারান তিনি। উন্নতি হুডাও প্রথম গেম জেতার পরেও পরের দুই গেমে ছন্দ ধরে রাখতে না পেরে চাইনিজ তাইপের প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হেরে যান। পুরুষ ডাবলসে সাত্ত্বিকসাইরাজ রাঙ্কিরেড্ডি ও চিরাগ শেট্টি জুটি প্রথম গেমে হারের পর সাত্ত্বিক কাঁধের চোটের কারণে ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ান। মিক্সড ডাবলসে ধ্রুব কাপিলা ও তানিশা ক্রাস্তো জুটি প্রথম রাউন্ডে জয় পেলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্বের এক নম্বর চিনা জুটির কাছে লড়াই করে হেরে যান। এই প্রেক্ষাপটে সিন্ধুর একক লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে আনাটাই এবারের জাপান ওপেনে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে উঠেছে।
জাপান ওপেন জয়ের আগে থেকেই পিভি সিন্ধু ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের অন্যতম সফল মুখ। হায়দরাবাদে ১৯৯৫ সালের ৫ জুলাই জন্ম নেওয়া সিন্ধু আট বছর বয়সে র্যাকেট হাতে তোলেন এবং পরে পুল্লেলা গোপীচাঁদের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক ২০১৬ রিও অলিম্পিকের রুপো — ব্যাডমিন্টনে ভারতের প্রথম অলিম্পিক পদকজয়ী মহিলা তিনি — এবং ২০২০ টোকিও অলিম্পিকের (২০২১ সালে অনুষ্ঠিত) ব্রোঞ্জ, যার মাধ্যমে তিনি পরপর দুটি অলিম্পিক পদক জেতা প্রথম ভারতীয় মহিলা হয়ে ওঠেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও তাঁর রেকর্ড উজ্জ্বল — ২০১৯ সালে বাসেলে সোনা জিতে তিনি হয়ে ওঠেন এই প্রতিযোগিতায় সোনাজয়ী প্রথম ভারতীয়, এছাড়া ২০১৭ ও ২০১৮ সালে রুপো এবং ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ব্রোঞ্জ সহ মোট পাঁচটি পদক জিতেছেন তিনি, যা কোনও ভারতীয় শাটলারের সর্বোচ্চ। কমনওয়েলথ গেমসে ২০১৮ সালে সিঙ্গলসে রুপো ও মিক্সড টিমে সোনা, এবং ২০২২ বার্মিংহাম গেমসে সোনা জিতেছেন তিনি, পাশাপাশি ২০১৮ এশিয়ান গেমসেও রুপো রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ২০১৮ সালে বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফাইনালসও জিতেছিলেন সিন্ধু। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন পদ্মভূষণ (২০২০), পদ্মশ্রী (২০১৫), রাজীব গান্ধী খেলরত্ন এবং অর্জুন পুরস্কারের মতো সম্মাননা। এই সমৃদ্ধ রেকর্ডের প্রেক্ষাপটেই জাপান ওপেন জয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে — এটি এমন একটি খেতাব ছিল, যা এতদিন সিন্ধুর হাতছাড়া ছিল, এবং যা তাঁর কেরিয়ারের ট্রফি-ক্যাবিনেটে একটি বড় শূন্যস্থান পূরণ করল।
জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্স-এ লেখেন, এটি ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, এবং সিন্ধুর এই সাফল্য দেশের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশাবাদী। জবাবে সিন্ধুও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান, এবং টোকিও অলিম্পিকের পর তাঁর সঙ্গে কাটানো একান্ত মুহূর্তগুলির কথা স্মরণ করেন। শুধু কেন্দ্রীয় স্তরেই নয়, রাজ্য রাজনীতির অলিন্দ থেকেও এসেছে অভিনন্দন-বার্তা। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু একে “ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের ঐতিহাসিক মাইলফলক” বলে অভিহিত করে সিন্ধুকে আসন্ন অলিম্পিকের জন্য শুভেচ্ছা জানান। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশও তাঁর অধ্যবসায় ও বিশ্বমানের দক্ষতার প্রশংসা করেছেন।
ক্রীড়ামহলের মতে, সিন্ধুর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ট্রফির গল্প নয় — এটি প্রমাণ করে যে বয়স বা দীর্ঘ খরা কোনওটাই একজন প্রকৃত চ্যাম্পিয়নের মানসিক দৃঢ়তাকে দমাতে পারে না। ৩১ বছর বয়সে, যেখানে অনেকেই কেরিয়ারের শেষ পর্যায়ের কথা ভাবতে শুরু করেন, সেখানে সিন্ধু যেভাবে র্যাঙ্কিংয়ের ঊর্ধ্বে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে শিরোপা জিতলেন, তা আসন্ন অলিম্পিকের আগে গোটা ভারতীয় দলের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বহন করে। এই জয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে আসন্ন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রাক্কালে, যা এবার আয়োজিত হতে চলেছে জাপানেই — ফলে ঘরের মাঠের সাফল্য সিন্ধুর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পিভি সিন্ধুর জাপান ওপেন জয় ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সংযোজন করল। ১৯ মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কেরিয়ারের মোড় ঘোরাবে না, বরং প্রমাণ করল যে অভিজ্ঞতা আর মানসিক দৃঢ়তার মিশেলে এখনও তিনি বিশ্বের সেরাদের অন্যতম। বাকি ভারতীয় শাটলারদের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের মাঝে সিন্ধুর এই একক লড়াই প্রমাণ করে দিল, কেন তিনি এখনও ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের সবচেয়ে ভরসাযোগ্য মুখ। আসন্ন টুর্নামেন্টগুলিতে, বিশেষত অলিম্পিকের আগে, এই ছন্দ ধরে রাখতে পারা তাঁর জন্য হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

