প্রযুক্তি ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে যুক্ত হল আরও একটি সোনালি অধ্যায়। শনিবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ হল দেশের প্রথম বেসরকারি ভাবে তৈরি কক্ষপথগামী রকেট বিক্রম-১। হায়দরাবাদ-ভিত্তিক মহাকাশ সংস্থা স্কাইরুট এরোস্পেসের এই মিশনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিশন আগমন’। উৎক্ষেপণের কিছুক্ষণের মধ্যেই রকেটটি সফলভাবে পৌঁছে যায় পৃথিবী থেকে ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার লো আর্থ অরবিটে এবং একে একে সব পেলোড কক্ষপথে স্থাপন করে। এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের হাতে গোনা যে কয়েকটি দেশ নিজস্ব বেসরকারি উদ্যোগে কক্ষপথগামী রকেট পাঠানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে, সেই তালিকায় তৃতীয় দেশ হিসেবে নাম লেখাল ভারত।
২০১৮ সালে দুই প্রাক্তন ইসরো বিজ্ঞানীর হাতে ১০ জনের দল নিয়ে যাত্রা শুরু করা হায়দরাবাদের স্কাইরুট এরোস্পেস শনিবার ইতিহাস গড়ল, যখন তাদের তৈরি বিক্রম-১ রকেট সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের মাত্র ১৫ মিনিটে, প্রথম প্রচেষ্টাতেই কোনও ত্রুটি ছাড়া ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে পৌঁছে গেল— এমন কীর্তি যা স্পেসএক্সও তাদের প্রথম রকেটে তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর অর্জন করেছিল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের পর ভারত হয়ে উঠল বেসরকারি অরবিটাল লঞ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় দেশ; প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্কাইরুট টিমকে অভিনন্দন জানান, আর মে মাসেই ১.১ বিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশনে ভারতের প্রথম স্পেস-টেক ইউনিকর্নে পরিণত হওয়া এই সংস্থা আজ ১,১০০-রও বেশি কর্মী নিয়ে দাঁড়িয়ে, চেন্নাইয়ের অগ্নিকুল কসমসের সঙ্গে যৌথভাবে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথে।
সাত তলা উঁচু রকেটের প্রযুক্তিগত কীর্তি
চার স্তরবিশিষ্ট, প্রায় সাত তলা সমান উচ্চতার বিক্রম-১ রকেটটি তৈরি হয়েছে তিনটি সলিড-প্রপেলান্ট স্তর ও একটি তরল জ্বালানিচালিত রামন ইঞ্জিন সমৃদ্ধ কক্ষপথ সমন্বয় মডিউল নিয়ে, যা নিখুঁতভাবে কক্ষপথে পেলোড বসাতে সাহায্য করে। ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির জনক ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের নামে নামাঙ্কিত এই রকেটের সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামো এবং থ্রি-ডি প্রিন্টেড ইঞ্জিন— দুটোই বাস্তব উড়ানে প্রথমবার পরীক্ষিত হল বলে দাবি সংস্থার। ২০২২ সালে সংস্থার সাব-অরবিটাল মিশন বিক্রম-এস সফল হওয়ার পর এটাই ছিল পরবর্তী বড় ধাপ— সম্পূর্ণ কক্ষপথে পৌঁছনোর চ্যালেঞ্জ, যা এবার সফলভাবে উতরে গেল স্কাইরুট।

উৎক্ষেপণের নির্ধারিত সময় ছিল সকাল সাড়ে এগারোটা, তবে পরিকল্পিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষার (planned hold) কারণে তা পিছিয়ে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে করা হয়। মেঘলা আকাশের নিচে কমলা রঙের ধোঁয়া ছড়িয়ে যখন রকেটটি প্রথম লঞ্চ প্যাড থেকে আকাশে উড়ে যায়, তখন মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন স্কাইরুটের দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন ইসরো বিজ্ঞানী পবন কুমার চন্দনা ও নাগা ভরত ডাকা, ইসরো প্রধান ভি নারায়ণন, প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যানরা, মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মন্ত্রী নারা লোকেশ।
প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন ও ‘বন্দে মাতরম’ বার্তা
সাফল্যের খবর পৌঁছাতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোন করে স্কাইরুট টিমকে অভিনন্দন জানান এবং তাদের সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই মিশন কেবল একটি রকেটের প্রথম উড়ান নয়, বরং ভারতের বেসরকারি রকেট নির্মাণ ক্ষমতার আগমন এবং দেশের মহাকাশ বাস্তুতন্ত্রের রূপান্তরের প্রতিফলন। ইসরোর দীর্ঘদিনের ভিত্তি, নীতিগত সংস্কার এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের শক্তির উপর দাঁড়িয়ে এই মিশন ভারতীয় শিল্প, স্টার্টআপ এবং বিশ্ব মহাকাশ অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং-ও এই সাফল্য উদযাপন করেন।
রকেটের সঙ্গে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ বার্তা সংবলিত একটি পোস্টকার্ড, প্রকৌশলী-বিজ্ঞানী-মহাকাশচারীদের পোস্টকার্ড, ১৮ ক্যারেট সোনার একটি ক্ষুদ্র রকেট ভাস্কর্য এবং বিক্রম সারাভাই, সি ভি রামন ও এপিজে আবদুল কালামের ক্ষুদ্র মূর্তি সংবলিত একটি মাইক্রো-আর্ট পেলোড, যা সংস্থার ভাষায় “ভারতের বৈজ্ঞানিক ও মহাকাশ যাত্রা গড়ে তোলা তিন দ্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য”।
একসঙ্গে মহাকাশে পাড়ি দিল একাধিক পরীক্ষামূলক পেলোড
শুধু রকেট প্রযুক্তি প্রদর্শনই নয়, বিক্রম-১ এর সঙ্গে কক্ষপথে পৌঁছেছে বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনী পেলোডও। গ্রহা স্পেসের কমপ্যাক্ট উপগ্রহ সোলারাস এস৩, কসমোসার্ভ স্পেসের এমব্রেস— মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ অপসারণে সক্ষম একটি রোবোটিক আর্মের ইন-অরবিট পরীক্ষা, স্কাইরুটের নিজস্ব পরীক্ষামূলক পেলোড স্কোপ, জার্মান সংস্থা ডিকিউবের দুটি পরীক্ষামূলক পেলোড এবং কসমস ডায়মন্ডসের তৈরি ল্যাব-গ্রোন হীরার শৈল্পিক কাজ ‘কসমিক ব্লুম’— সবই সফলভাবে স্থাপিত হয়েছে কক্ষপথে।

ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ইসপা) ডিরেক্টর জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ কে ভাট (অবসরপ্রাপ্ত) এই উৎক্ষেপণকে ভারতের মহাকাশ যাত্রার এক নির্ধারক মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন, যা প্রমাণ করে দিয়েছে যে দেশীয় শিল্প এখন সম্পূর্ণ মহাকাশ মিশন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যান এস সোমনাথের মতে, এই মিশন কেবল একটি রকেটের প্রথম কক্ষপথ যাত্রা নয়, বরং বছরের পর বছর উদ্ভাবন, নীতিগত সংস্কার ও ইসরোর গড়া মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় মহাকাশ বাস্তুতন্ত্রের এক বিরাট রূপান্তরের প্রতীক।
পয়লা চেষ্টাতেই নিখুঁত সাফল্য
রকেট বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটা প্রায় ঘটেই না— প্রথম চেষ্টাতেই কোনও ত্রুটি ছাড়া সরাসরি কক্ষপথে পৌঁছে যাওয়া। শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষেপণের মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই বিক্রম-১ পৌঁছে যায় ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে, তা-ও আবার প্রথম প্রয়াসেই। তুলনা করলে দেখা যায়, ২০০২ সালে যাত্রা শুরু করা ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-কে তাদের প্রথম রকেট ফ্যালকন ওয়ানকে কক্ষপথে সফলভাবে পাঠানোর আগে পরপর তিনবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই তুলনায় স্কাইরুটের এই প্রথম-প্রচেষ্টাতেই সাফল্য রকেট প্রযুক্তির দুনিয়ায় একটি ব্যতিক্রমী কীর্তি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য— এই রকেট ইসরোর তৈরি নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে একটি বেসরকারি স্টার্টআপের নিজস্ব নির্মাণ।
দশ জনের টিম থেকে ভারতের প্রথম স্পেস-টেক ইউনিকর্ন
স্কাইরুট এরোস্পেসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, দুই প্রাক্তন ইসরো বিজ্ঞানী পবন কুমার চন্দনা ও নাগা ভরত ডাকার হাত ধরে, মাত্র ১০ জনের একটি ছোট্ট দল নিয়ে। আট বছরের ব্যবধানে সেই সংস্থাই আজ ১,১০০-রও বেশি কর্মী নিয়ে দাঁড়িয়ে। চলতি বছরের মে মাসে সংস্থাটি হয়ে ওঠে ভারতের প্রথম স্পেস-টেক ইউনিকর্ন, যার মূল্যায়ন পৌঁছায় প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারে। জিআইসি (সিঙ্গাপুরের সভরেন ওয়েলথ ফান্ড), শের্পালো ভেঞ্চার্স এবং ব্ল্যাকরকের মতো বিনিয়োগকারী সংস্থার নেতৃত্বে এখনও পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ১৬০ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সংস্থার প্রকৌশলী দলের একটা বড় অংশের গড় বয়স মাত্র ২০-এর কোঠায়, যা প্রমাণ করে তরুণ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের হাতেই তৈরি হচ্ছে দেশের মহাকাশ ভবিষ্যৎ।
একা নয় স্কাইরুট, বেসরকারি স্পেস রেসে আরও প্রতিযোগী
২০২০ সালের আগে পর্যন্ত ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্র ছিল সম্পূর্ণভাবে সরকারের একচেটিয়া অধিকারে। সেই বছর সরকার এই ক্ষেত্র বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য খুলে দেওয়ার পরেই একের পর এক স্টার্টআপ এই দৌড়ে যোগ দিতে শুরু করে। স্কাইরুট ছাড়াও চেন্নাই-ভিত্তিক অগ্নিকুল কসমস থ্রি-ডি প্রিন্টেড ইঞ্জিন তৈরি করছে, পিক্সল তৈরি করছে উপগ্রহ যা ব্যবহার করছে খোদ নাসা, আর ধ্রুব স্পেস ও দিগন্তরার মতো সংস্থাও এই প্রতিযোগিতায় সক্রিয়। তবে এই পথ মসৃণ নয়— অগ্নিকুলের একাধিক উৎক্ষেপণ প্রচেষ্টা মাঝপথে বাতিল করতে হয়েছে, আর সম্প্রতি ইসরোরও দুটি মিশন ব্যর্থ হয়েছে। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যর্থতা-সাফল্যের এই মিশ্র অভিজ্ঞতাই একটি পরিণত মহাকাশ শিল্প গড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সাফল্য?
মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াই আর শুধু পৃথিবীর মাটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না— ইন্টারনেট, জিপিএস, প্রতিরক্ষা, খনিজ সম্পদ আহরণ, এমনকি ভবিষ্যতের এআই ডেটা সেন্টার পর্যন্ত ক্রমশ নিয়ন্ত্রিত হবে মহাকাশ থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স ইতিমধ্যে রকেট পুনর্ব্যবহারের প্রযুক্তিতে এগিয়ে, আর চিনও নিজস্ব বেসরকারি রকেট সংস্থা নিয়ে এই দৌড়ে সক্রিয়। এই প্রেক্ষাপটে বিক্রম-১-এর সাফল্য শুধু একটি প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং বিশ্ব মহাকাশ প্রতিযোগিতায় ভারতের অবস্থান মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রতিষ্ঠাতাদের ভাষায় বলতে গেলে, এই মডেল অনেকটা “উপগ্রহের জন্য ক্যাব সার্ভিস”-এর মতো— রকেট বুক করুন, উপগ্রহ পৌঁছে যাবে কক্ষপথে। আগামী দিনে এই ক্রমবর্ধমান স্পেস ইন্ডাস্ট্রি তরুণ প্রজন্মের জন্য তৈরি করতে পারে সম্পূর্ণ নতুন এক কর্মক্ষেত্রও।
বাড়ছে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি
সরকারি নীতিগত সংস্কারের হাত ধরে দ্রুত বাড়ছে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি। বর্তমানে যার মূল্য আনুমানিক ৮৪০ কোটি মার্কিন ডলার, তা ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ গুণ বেড়ে ৪০০০-৪৫০০ কোটি ডলারে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের মহাকাশ ক্ষেত্র সংস্কারের পর থেকেই বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য উৎক্ষেপণ কার্যক্রমের দরজা খুলে যাওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসংহার
বিক্রম-১ এর সফল কক্ষপথ যাত্রা শুধু একটি সংস্থার প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি গোটা ভারতীয় মহাকাশ শিল্পের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। ইসরোর ছয় দশকের অভিজ্ঞতা ও পরিকাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে এখন বেসরকারি সংস্থাগুলিও নিজেদের রকেট তৈরি করে কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম— এই বার্তাই দিল স্কাইরুট এরোস্পেসের মিশন আগমন। আগামী দিনে ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ববাজারে ভারতের অবস্থান আরও মজবুত হবে বলে আশা বিশেষজ্ঞদের। মহাকাশ প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা আর বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই মেলবন্ধনই আগামী দিনে ভারতকে বিশ্ব মহাকাশ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

