- ট্রাম্পের নেটো সমালোচনার পর ইউরোপে বাড়ছে স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতির আলোচনা। আমেরিকার উপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ কি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর পথে হাঁটছে?
আটলান্টিক জোট NATO-এর ভিতরে ফের শুরু হয়েছে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump বারবার নেটো সদস্য দেশগুলির প্রতিরক্ষা ব্যয়, আমেরিকার ভূমিকা এবং ইউরোপের নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ইউরোপের একাংশে নতুন ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হওয়া নেটো দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। রাশিয়ার আগ্রাসন এবং পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা সংকটের সময় আমেরিকার সামরিক শক্তি ইউরোপীয় দেশগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে ইউরোপের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রশ্ন, ইউরোপের দায়িত্ব কতটা?
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে নেটোর অনেক সদস্য দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করছে না এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকার উপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে।
তার যুক্তি, ইউরোপীয় দেশগুলিকে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে হবে। এই অবস্থান নেটোর অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে—যদি ভবিষ্যতে আমেরিকার প্রতিশ্রুতি কমে যায়, তাহলে ইউরোপ কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
ইউরোপের মধ্যে বাড়ছে ‘কৌশলগত স্বনির্ভরতা’র আলোচনা
ফ্রান্স, জার্মানি-সহ একাধিক ইউরোপীয় দেশ মনে করছে, মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য শুধুমাত্র আমেরিকার উপর নির্ভর করে থাকা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ বুঝতে পেরেছে যে প্রতিরক্ষা শিল্প, অস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।
ফ্রান্সের পক্ষ থেকে বহুবার ইউরোপীয় ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণা সামনে আনা হয়েছে। এর অর্থ নেটো থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়, বরং প্রয়োজনে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
রাশিয়া ও চিনের চ্যালেঞ্জ
ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনার পিছনে শুধু আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নয়, রয়েছে রাশিয়া ও চিনের মতো শক্তির উত্থানও।
Russia-র সামরিক তৎপরতা এবং ইউক্রেন সংঘাত ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে China-র বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনাও পশ্চিমা দেশগুলির কৌশলগত চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নেটোর জন্য একটি পরীক্ষার সময়। জোটের সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং আমেরিকা-ইউরোপ সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
একদিকে ইউরোপ চায় আমেরিকার নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় থাকুক, অন্যদিকে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও বাড়াতে চাইছে।
ভারত ও বিশ্বের উপর প্রভাব
নেটোর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন শুধু ইউরোপ বা আমেরিকার বিষয় নয়। বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যের উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইউরোপ যদি আরও স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অস্ত্র বাজার এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটের কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নেটো কি আগের মতো আমেরিকা নেতৃত্বাধীন জোট হিসেবেই থাকবে, নাকি ইউরোপ ধীরে ধীরে নিজের নিরাপত্তার জন্য আলাদা শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে?
আগামী কয়েক বছরেই এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে।

