সংক্ষিপ্ত সারাংশ: “স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে” ছবিতে পিটার পার্কারকে মুখোমুখি হতে হয় গভীর একাকীত্ব আর নিজের বিবর্তিত ক্ষমতার সঙ্গে লড়াইয়ের, যেখানে এমজে ও নেড সহ সবাই তাঁকে ভুলে গেছেন। ছবির প্রকৃত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যায় সেডি সিঙ্ক অভিনীত জিন গ্রে-কে, যিনি নিজের বোনকে খুঁজতে গিয়ে পিটারকে মানসিকভাবে জালে ফেলেন। সমালোচকদের মতে টম হল্যান্ডের অভিনয় তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে পরিণত পারফরম্যান্স, আর ছবির শেষে নেডের সঙ্গে পুরনো হ্যান্ডশেকের দৃশ্য হলজুড়ে দর্শকদের বিস্মিত করেছে। “বিশ্ব ধ্বংসের” গতানুগতিক ছকে না গিয়ে ব্যক্তিগত ও আবেগঘন গল্প বলার কারণে এই ছবিকে এমসিইউ-র সেরা স্পাইডার-ম্যান সিনেমা বলে অভিহিত করছেন সমালোচকরা।
বিনোদন ডেস্ক: সুপারহিরো সিনেমার জগতে স্পাইডার-ম্যান বরাবরই একটু আলাদা জায়গা দখল করে রেখেছেন – সাধারণ মানুষের রোজকার লড়াই, একাকীত্ব আর দায়িত্ববোধের মিশেলে গড়া এই চরিত্র বহু বছর ধরে দর্শকদের মন জয় করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই মুক্তি পেল নতুন ছবি “স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে”, যা একাধিক সমালোচকের মতে এখনও পর্যন্ত মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের (MCU) সেরা স্পাইডার-ম্যান ছবি, এমনকি বহুদিন পর সুপারহিরো ঘরানায় সত্যিকারের আবেগ জাগিয়ে তোলা একটি সিনেমা।
পিটার পার্কারের জীবনে নতুন সংকট
আগের ছবি “নো ওয়ে হোম”-এর শেষে দেখা গিয়েছিল, পিটার পার্কার তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছেন – বন্ধু নেড এবং প্রেমিকা এমজে সহ সবার স্মৃতি থেকে তিনি মুছে গেছেন এক জাদুমন্ত্রের প্রভাবে, মাল্টিভার্সের বিপর্যয় থেকে সবাইকে রক্ষা করতে গিয়ে। নতুন ছবিতে দেখা যায়, নেড ও এমজে দুজনেই এমআইটি-তে পড়াশোনা করতে চলে গেছেন, আর এমজে এখন সম্পর্কে জড়িয়েছেন অন্য কারও সঙ্গে। প্রায় চার বছর পর একাকী পিটার এখনও নিউইয়র্ক পুলিশ গোয়েন্দা জিন ডিওলফের সঙ্গে মিলে শহরের নিরাপত্তা রক্ষা করে চলেছেন, তবু ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা এবং বিষণ্ণ। এমজের নতুন প্রেমিকের কথা জানার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি, যার প্রভাব পড়ে তাঁর ক্ষমতার উপরেও।
নতুন ক্ষমতা, নতুন প্রশিক্ষণ
এই ছবিকে অনেকটাই এক ধরনের “রিবুট” হিসেবে দেখানো হয়েছে — পিটারের শরীরে ডিএনএ পরিবর্তনের ফলে তাঁর ভেতরের স্পাইডার বৈশিষ্ট্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এখন তিনি নিজের শরীর থেকেই জৈবিকভাবে ওয়েব ছুঁড়তে পারেন, আর তাঁর ইন্দ্রিয়ও হয়ে উঠেছে আরও তীক্ষ্ণ। এই নতুন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে তাঁকে ফিরে যেতে হয় নতুন করে প্রশিক্ষণের পথে, আর এই বিষয়ে পরামর্শ নিতে তিনি যান ব্রুস ব্যানারের (মার্ক রুফালো) কাছে, যিনি এখন হাল্কগিরি ছেড়ে কলেজে পদার্থবিদ্যা পড়ান। পরে ব্যানার হাল্ক রূপে ফিরে আসেন এবং দুজনে মিলে ছবির অন্যতম সেরা অ্যাকশন দৃশ্য উপহার দেন।
আসল প্রতিপক্ষ আসলে কে
ছবির মূল “ভিলেন” চরিত্রে রয়েছেন স্ট্রেঞ্জার থিংস খ্যাত সেডি সিঙ্ক, যিনি এক্স-মেন কমিক্স থেকে পরিচিত চরিত্র জিন গ্রে-র ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তবে গল্পের বাঁকে দেখা যায়, তিনি প্রকৃত অর্থে খলনায়িকা নন – বরং তিনি ড্যামেজ কন্ট্রোলের হাতে অপহৃত নিজের বোনকে খুঁজে বের করার মরিয়া চেষ্টায় রয়েছেন। যে কারও শরীরে প্রবেশ করে দখল নেওয়ার এবং প্রয়োজনে দ্রুত শরীর বদলে ফেলার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর, আর এই ক্ষমতা ব্যবহার করেই তিনি পিটারকে নানাভাবে মানসিক জালে ফেলার চেষ্টা করেন।
টম হল্যান্ডের অভিনয়ে নতুন মাত্রা
সমালোচকদের মতে, এই ছবিতে টম হল্যান্ডের অভিনয় তাঁর এখনও পর্যন্ত করা সবচেয়ে পরিণত এবং মাটির কাছাকাছি থাকা পারফরম্যান্স। প্রিয় সুপারহিরোর অ্যাকশন-ভরপুর অবতারের পাশাপাশি এই ছবি তাঁকে এমন এক মানসিক গভীরতায় নিয়ে যায়, যা আগে খুব কমই দেখা গেছে। পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটনের হাত ধরে চরিত্রটি পেয়েছে নতুন স্টাইল, হৃদয় এবং গভীরতা।
পানিশার ও রহস্যময় প্রতিপক্ষের আগমন
ছবিতে বড় পর্দায় প্রথমবার দেখা মিলল জন বার্নথালের ফ্রাঙ্ক কাসল ওরফে দ্য পানিশারের। স্পাইডার-ম্যানের ‘কাউকে হত্যা না করার’ নীতির সঙ্গে পানিশারের সরাসরি সংঘাতমূলক পদ্ধতির সংঘর্ষ ছবির অন্যতম আকর্ষণীয় ও মজাদার দিক হয়ে উঠেছে – দুজনের রসায়ন নিয়ে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন সমালোচকরা।
“ছোট আকারের বিপদ” যেভাবে ছবিকে আলাদা করে তুলেছে
সাম্প্রতিক অনেক সুপারহিরো ছবির মূল সমস্যা হল, প্রতিবারই গল্প শেষমেশ “গোটা পৃথিবী ধ্বংসের মুখে” গিয়ে দাঁড়ায়, যা দর্শকদের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠেছে বলে মত এক সমালোচকের। “ব্র্যান্ড নিউ ডে” সেই ফাঁদে পা দেয়নি — বরং গল্পটাকে ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রেখে অনেক বেশি সম্পর্কযুক্ত এবং আবেগপূর্ণ করে তুলেছে, যা তাঁর মতে সাম্প্রতিক এমসিইউ ছবিগুলির তুলনায় বড় একটা পরিবর্তন।
ছবির শেষ দৃশ্য — যা হলজুড়ে দর্শকদের চমকে দিয়েছে
ছবির একেবারে শেষে এমন একটি দৃশ্য রয়েছে, যা একাধিক প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের সম্মিলিত বিস্ময়ধ্বনি তুলেছে বলে জানিয়েছেন সমালোচকরা। ভালোবাসার প্রকৃত শক্তি দিয়ে এমজের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, ছবির শেষে পিটার নেডের সঙ্গে দেখা করে তাদের পুরনো, বিশেষ হ্যান্ডশেক করেন – আর সেই মুহূর্তেই নেডের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে চেনার আনন্দ। সমালোচকদের মতে, এই দৃশ্য প্রমাণ করে দেয় যে গল্পের আসল ভিত্তি প্রেম নয়, বরং গভীর বন্ধুত্ব – এমন এক সম্পর্ক, যা কোনও জাদুমন্ত্রও মুছে ফেলতে পারে না।
একই সপ্তাহে নোলানের ছবির সঙ্গে মিল
কাকতালীয়ভাবে, টম হল্যান্ড, জন বার্নথাল এবং জেনদায়া – তিনজনেই সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের “দ্য ওডিসি” ছবিতেও অভিনয় করেছেন, যা মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মুক্তি পেয়ে বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পেয়েছে। দুটি ছবির মূল সুরও অদ্ভুতভাবে মিলে যায় – দুটোতেই একজন একাকী নায়ক তাঁর প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার লড়াই করছেন, অতীতের ক্ষত ও ত্যাগের মূল্য বহন করে।
উপসংহার
“স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে” শুধু আরেকটি সুপারহিরো ছবি নয় – এটি চরিত্র নির্মাণ, আবেগ এবং অ্যাকশনের এক নিখুঁত মিশেল, যা প্রমাণ করে কেন এই ফ্র্যাঞ্চাইজি এখনও দর্শকদের কাছে এত প্রিয়। টম হল্যান্ডের পরিণত অভিনয়, নিউইয়র্কের নিখুঁত পুনর্নির্মাণ, পানিশার ও জিন গ্রে-র সংযোজন, আর সবচেয়ে বড় কথা – বন্ধুত্বের শক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হৃদয়স্পর্শী পরিসমাপ্তি – সব মিলিয়ে এই ছবি সুপারহিরো ঘরানায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে বলে মত সমালোচকদের একটা বড় অংশের। এই সাফল্য সাময়িক ঝলক নাকি এমসিইউ-র নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা, তা সময়ই বলে দেবে – তবে বড় পর্দায় দেখার মতো একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে এই ছবি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
