সংক্ষিপ্ত সারাংশ: রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে বন্দে মাতরম বিল, যা এই জাতীয় গানকে জাতীয় সঙ্গীতের সমান আইনি সুরক্ষা দেবে -অবমাননা করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। নিট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্যেই ধ্বনি ভোটে পাশ হয় বিলটি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়ালে মুসলিম নেতাদের সমর্থনের আহ্বান জানালেও, AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি বিলটিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনকারী বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা এই ইস্যুতে স্পষ্ট মতবিভেদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতীয় সম্মান রক্ষায় বড় পদক্ষেপ নিল সংসদ। বুধবার রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গেল “প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (সংশোধনী) বিল, ২০২৬”। এই বিলের মূল লক্ষ্য একটাই -বন্দে মাতরমকে অবমাননা করলে তা এবার থেকে গণ্য হবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে, ঠিক যেমন জাতীয় সঙ্গীত জনগণমনের ক্ষেত্রে আগে থেকেই আইন রয়েছে।
নিজস্ব সংবাদদাতা: সংসদে জাতীয় সম্মান সংক্রান্ত আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে আরেক ধাপ এগোল কেন্দ্র। বুধবার রাজ্যসভায় ধ্বনি ভোটে পাশ হয়েছে ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’। বিলটি আইনে পরিণত হলে ‘বন্দে মাতরম’-এর ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা গানের সময় বাধা সৃষ্টি করাও জাতীয় সঙ্গীতের মতোই শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আসবে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, এই আইন কোনও নাগরিককে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে বাধ্য করবে না। শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃতভাবে গান বন্ধ করা, বিঘ্ন ঘটানো বা অসম্মানজনক আচরণ করাকেই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কী বলছে এই নতুন আইন
১৯৭১ সালের প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বন্ধ করা বা কোনও সমাবেশে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় বিঘ্ন সৃষ্টি করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা উভয় শাস্তিরই বিধান রয়েছে। এবার সংশোধিত বিলের মাধ্যমে ঠিক একই ধরনের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে বন্দে মাতরমকেও। তবে একটা কথা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে – এই আইন কাউকে বন্দে মাতরম গাইতে বাধ্য করছে না, শুধু ইচ্ছাকৃতভাবে গান বন্ধ করা বা বিঘ্ন ঘটানোকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করছে।
১৫০ বছর পূর্তির বছরেই এই সিদ্ধান্ত
এই বছরটা এমনিতেই বিশেষ – বন্দে মাতরম রচনার ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপন চলছে দেশজুড়ে, যা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং চলবে ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। এই প্রেক্ষাপটেই সরকার মনে করছে, জাতীয় সঙ্গীতের মতোই বন্দে মাতরমকেও সমান মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালে জনগণমন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সময় গণপরিষদের সভাপতি নিজেই বলেছিলেন, বন্দে মাতরমও সমান সম্মান পাবে — তবে সেই বিষয়ে তখন কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।
সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক, বিরোধীদের ওয়াকআউট
বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় সংসদের ছবিটা অবশ্য মোটেই শান্ত ছিল না। নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে ছাত্র বিক্ষোভের উপর পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিরোধীরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে মধ্যাহ্নভোজ পরবর্তী অধিবেশনে ওয়াকআউট করেন। শেষ পর্যন্ত ধ্বনি ভোটে পাশ হয় বিলটি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বিতর্কের জবাবে বলেন, এই বিল নিছক একটা আইন নয়, বরং তা ভারতের আত্মা, জাতীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তিনি কংগ্রেসের অবস্থানের কড়া সমালোচনা করে বলেন, দেশের যুবসমাজ সবটাই দেখছে।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চলছে বিতর্ক
তবে এই আইন নিয়ে আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে ভিন্নমতও দেখা যাচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এই সংশোধনীকে যেন কোনওভাবেই নাগরিকদের বন্দে মাতরম গাইতে বাধ্য করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করা না হয়। দেশপ্রেম, সাংবিধানিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় গর্বের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক চলছিল, এই বিল তাকে ফের সামনে নিয়ে এসেছে।
মুসলিম নেতাদের প্রতিক্রিয়াতেও দ্বিমত
এই বিল নিয়ে মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও দেখা গেছে ভিন্ন মেরুর প্রতিক্রিয়া। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আটওয়ালে মন্তব্য করেছেন, “মুসলিম নেতাদের এই বিলের বিরোধিতা করা উচিত নয়, কারণ মোদী সরকার বন্দে মাতরমকে গুরুত্ব দিয়েছে এই কারণেই যে এটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করে।
অন্যদিকে, লোকসভায় বন্দে মাতরম বিল পাশ হওয়ার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন AIMIM সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। তাঁর বক্তব্য, “বন্দে মাতরম গানে দেবদেবীর পূজার উল্লেখ রয়েছে, যা সংবিধানের ২৫, ২৬ এবং ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সংখ্যালঘু রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্দরেও এই বিল নিয়ে ঐকমত্য নেই”।
উপসংহার
জাতীয় প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার নামে সংসদে পাশ হওয়া এই বিল একদিকে যেমন বন্দে মাতরমকে জাতীয় সঙ্গীতের সমান আইনি মর্যাদা দিচ্ছে, তেমনই তা নতুন করে উস্কে দিয়েছে দেশপ্রেম বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতার পুরনো বিতর্ক। শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে যেমন মতবিরোধ স্পষ্ট, তেমনই মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্দরেও এই ইস্যুতে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে এই আইন কার্যকর হবে, তবে ততদিনে সংসদের অন্দরে ও বাইরে এই নিয়ে রাজনৈতিক তরজা যে থামবে না, তা এই ঘটনাক্রম থেকেই স্পষ্ট।
