Tuesday, August 18, 2026

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউরোপে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল নয়াদিল্লি। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উত্তর মেসিডোনিয়া সফর দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এই সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনও ভারতীয় রাষ্ট্রপতি উত্তর মেসিডোনিয়া সফর করলেন।

স্কোপিয়ের ভিলা ভোদনো-তে উত্তর মেসিডোনিয়ার রাষ্ট্রপতি গর্দানা সিলিয়ানোভস্কা-দাভকোভা-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও প্রতিনিধিদল পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মুর্মু। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতেও মতবিনিময় করেন। উভয় দেশই গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মাদার টেরিজার স্মৃতি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সেতুবন্ধন

ভারত ও উত্তর মেসিডোনিয়ার সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকেও গভীর। বিশ্বের অন্যতম মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব মাদার টেরিজা উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়ে-তে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ভারতে এসে মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর এই উত্তরাধিকার আজও দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটি অনন্য আবেগের সেতুবন্ধন তৈরি করে রেখেছে।

স্কোপিয়েতে অনুষ্ঠিত ভারত-উত্তর মেসিডোনিয়া বিজনেস ফোরামে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু দুই দেশের বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ, সবুজ জ্বালানি এবং সৃজনশীল শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। ছবির উৎস: x@rashtrapatibhvn

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য

বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও, আগামী দশকের শেষ নাগাদ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে যেসব খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল—

  • তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও ITES
  • ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরিষেবা
  • কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ
  • বায়োটেকনোলজি ও বস্ত্রশিল্প
  • পর্যটন ও আতিথেয়তা
  • চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সৃজনশীল শিল্প
  • নবায়নযোগ্য শক্তি

দুই দেশের সরকার মনে করছে, ব্যবসায়িক সংযোগ বৃদ্ধি পেলে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় বড় ঘোষণা

সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘোষণা ছিল Indian Technical and Economic Cooperation (ITEC) কর্মসূচি নিয়ে। রাষ্ট্রপতি মুর্মু জানান, উত্তর মেসিডোনিয়ার জন্য ভারতের ITEC প্রশিক্ষণ আসনের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হবে। নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI)-সংক্রান্ত বিশেষ কোর্সও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে নতুন সম্ভাবনা

দুই দেশ স্বাস্থ্য পরিষেবা ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তি ও জলবায়ু মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে উত্তর মেসিডোনিয়া।

ভারত International Solar Alliance (ISA), Coalition for Disaster Resilient Infrastructure (CDRI) এবং Global Biofuels Alliance-এর মতো বৈশ্বিক উদ্যোগে উত্তর মেসিডোনিয়ার যোগদানের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে পারবে।

ইন্ডিয়া-নর্থ মেসিডোনিয়া বিজনেস ফোরাম

সফরের অংশ হিসেবে স্কোপিয়েতে প্রথম India-North Macedonia Business Forum-এরও আয়োজন করা হয়। এতে দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও শিল্পপতিরা অংশ নেন। প্রযুক্তি, উৎপাদন, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও উদীয়মান শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এই ফোরাম ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করার উদ্যোগ

রাষ্ট্রপতি মুর্মু তাঁর বক্তব্যে বলেন, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগই দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চলচ্চিত্র, সৃজনশীল শিল্প এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সফরকালে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও মানবিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার বার্তাও দেন তিনি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সফর?

আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরের তাৎপর্য শুধু একটি ঐতিহাসিক সফরেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ইউরোপের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কৌশল নিয়েছে। উত্তর মেসিডোনিয়া সেই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য শক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্টার্ট-আপ সহযোগিতা আগামী দিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

অন্যদিকে, স্কোপিয়েতে মহাত্মা গান্ধীর আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন এবং মাদার টেরিজার জন্মভূমিতে ভারতীয় রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি এই সফরে এক অনন্য মানবিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করেছে। ফলে এই সফর কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নয়, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ আরও মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

উপসংহার

মলদোভা-উত্তর মেসিডোনিয়া-রোমানিয়া সফরের এই পর্বটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের আকার নয়, পারস্পরিক স্বার্থ, আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। মাদার টেরিজার জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সংসদে ভাষণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যৌথ প্রশিক্ষণের ঘোষণা, স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে সহযোগিতা এবং মহাত্মা গান্ধীর আবক্ষ মূর্তি উন্মোচনের মতো উদ্যোগ এই সফরকে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

আগামী দিনে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলি কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায়, সেটাই হবে নজরকাড়া বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, এই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ভারত-উত্তর মেসিডোনিয়া সম্পর্ককে একটি নতুন ভিত্তি দিয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই এই সফরের ইতিবাচক প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসের পাতায় এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ভারত ও উত্তর মেসিডোনিয়ার বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের নতুন সূচনা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave A Reply

Exit mobile version