Tuesday, August 18, 2026

নিজস্ব সংবাদদাতা: দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) নিয়ে যখন রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই আইন বাস্তবায়নের পথে একধাপ এগিয়ে গেল মধ্যপ্রদেশ। রাজ্য বিধানসভায় তীব্র বিরোধিতার মধ্যেই পাশ হয়ে গেল ইউসিসি বিল, আর এর মধ্য দিয়ে উত্তরাখণ্ড, অসম ও গুজরাটের পর দেশের চতুর্থ রাজ্য হিসেবে এই তালিকায় নাম লেখাল মধ্যপ্রদেশ। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে লিভ-ইন সম্পর্ক—ব্যক্তিগত জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের সূচনা করতে চলেছে এই আইন। কী ঘটল বিধানসভায়, আর ঠিক কী কী বদল আসছে সাধারণ মানুষের জীবনে—বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

বিধানসভায় উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে পাশ হল বিল

বিধানসভার ভেতরে তখন উত্তাল পরিস্থিতি। একদিকে স্লোগান তুলছেন কংগ্রেস বিধায়করা, অন্যদিকে ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। এই হট্টগোলের মধ্যেই কণ্ঠভোটে পাশ হয়ে গেল মধ্যপ্রদেশের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল।

বিল উত্থাপন থেকে পাশ হওয়া পর্যন্ত

সোমবার, বর্ষা অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রযুক্তিগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী গৌতম টেটওয়াল বিলটি বিধানসভায় পেশ করেন। মঙ্গলবার এই বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, এবং শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের জবাবি ভাষণের পর স্পিকার নরেন্দ্র সিং তোমার কণ্ঠভোটে বিলটি পাশ করান।

কংগ্রেসের আপত্তি ও সিলেক্ট কমিটির দাবি

আলোচনার শুরুতেই কংগ্রেসের প্রবীণ বিধায়ক আরিফ মাসুদ বিলের একাধিক অসঙ্গতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই সংসদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ সংশ্লিষ্ট বিল তিন বছর ধরে ল কমিশনে ঝুলে রয়েছে। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার সংক্রান্ত যে মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে, রাজ্যের এই বিল তা লঙ্ঘন করছে বলেও দাবি করেন তিনি। বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন মাসুদ, যদিও কণ্ঠভোটে সেই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। বিরোধী দলনেতা উমঙ্গ সিঙ্গার আবার বলেন, এই মুহূর্তে মধ্যপ্রদেশে ইউসিসি-র কোনও প্রয়োজনই নেই—বরং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের দাবিটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। শেষ পর্যন্ত আলোচনায় কোনও কংগ্রেস বিধায়কই অংশ নেননি।

মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা আক্রমণ

বিরোধীদের আক্রমণের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব বেশ কড়া ভাষায় জবাব দেন। মুসলিম তোষণের জন্যই কংগ্রেস এই বিলের বিরোধিতা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন, এবং কংগ্রেসকে আদিবাসী-বিরোধী বলেও আখ্যা দেন—যদিও তিনি নিজেই উল্লেখ করেন যে আদিবাসী সম্প্রদায়কে এই বিলের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যাদবের কথায়, রাজ্যের সাড়ে আট কোটি মানুষের জন্য এটি একটি সোনালি দিন, এবং সাম্যের এই আইন বিশেষভাবে উপকৃত করবে নারীদের।

মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, খসড়া কমিটির সামনে ৭৬ শতাংশ মুসলিম মা-বোন এবং ৪০ শতাংশ মুসলিম ভাই এই আইনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের তোষণনীতির কারণেই বহু নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ, যদিও তিন তালাক বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুসলিম নারীদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

আইনে কী কী বদল আসছে

এবার আসা যাক, আসলে কী কী বদল আসছে এই আইনে। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার এবং লিভ-ইন সম্পর্ক—মূলত এই চারটি ক্ষেত্রেই বড়সড় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে বিলে। বিয়ের ন্যূনতম বয়স মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছরই থাকছে, তবে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন এখন থেকে বাধ্যতামূলক। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে—একসময়ে একটির বেশি বৈধ বিয়ে থাকবে না রাজ্যে। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে “তালাক তালাক তালাক” বলে সম্পর্ক ভাঙার রীতি আর চলবে না, বরং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তা করতে হবে। এমনকি লিভ-ইন সম্পর্কেও এবার থেকে সরকারি নথিভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। বিবাহিত অবস্থায় কেউ যদি প্রতারণা করে লিভ-ইনে থাকেন, তাহলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও ছেলে ও মেয়ে—উভয়েই সমান অধিকার পাবেন, ধর্ম নির্বিশেষে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

এবার কী হবে — রাজ্যপালের সম্মতির অপেক্ষা

মুখ্যমন্ত্রী যাদব সাংবাদিকদের বলেন, এই আইন কার্যকর হওয়ার পর রাজ্যের সব ধর্মের মানুষ একই আইনের অধীনে বসবাস করবেন—কেউ আর তিন তালাক, হালালা প্রথা বা লিভ-ইন সম্পর্কের অপব্যবহার করতে পারবেন না, এবং কারও সম্পত্তির ওপর অন্যায় দাবিও তোলা যাবে না। আরএসএস-এর এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, যদি সেই এজেন্ডা জাতীয়তাবাদী হয়, তাহলে তা একশোবার বাস্তবায়ন করতেও তাঁর দল প্রস্তুত। এখন বিলটি রাজ্যপালের কাছে সম্মতির জন্য পাঠানো হবে, এবং তাঁর অনুমোদন পেলেই তা আইনে পরিণত হবে।

উপসংহার

মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাশ হওয়া নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বিয়ে-বিবাহবিচ্ছেদ-উত্তরাধিকারের মতো ব্যক্তিগত জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরির এই প্রচেষ্টা যেমন সরকারের পক্ষ থেকে নারী-অধিকার ও সাম্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তেমনই বিরোধীরা একে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করছেন। রাজ্যপালের সম্মতির পর আইনটি বাস্তবে কার্যকর হলে তা মধ্যপ্রদেশের প্রতিদিনের জীবনে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে, আর দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এই ধরনের আইনের পথ কতটা প্রশস্ত করে দেয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave A Reply

Exit mobile version