Tuesday, August 18, 2026

সংক্ষিপ্ত সারাংশ: DRDO-র GTRE ও হায়দরাবাদের আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথভাবে তৈরি করল ভারতের প্রথম দেশীয় ৩৫০ কেজি থ্রাস্ট ক্লাসের এক্সপেন্ডেবল টার্বো জেট ইঞ্জিন, যা ২২ জুলাই হস্তান্তর করা হয়। ক্রুজ মিসাইল ও লোইটারিং মিউনিশনে ব্যবহারযোগ্য এই ইঞ্জিন যুদ্ধবিমানের জন্য নয়, তবে চার দশক আগে শুরু হওয়া কাবেরী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ধাপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করে ভারতীয় বেসরকারি শিল্প এখন সম্পূর্ণ প্রপালশন সিস্টেম তৈরিতে সক্ষম, তবে AMCA-র জন্য প্রয়োজনীয় ১২০ কিলোনিউটন ইঞ্জিন তৈরিই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

 প্রযুক্তি ডেস্ক : প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতার পথে আরও এক ধাপ এগোল ভারত। দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রথমবার তৈরি হল ৩৫০ কেজি থ্রাস্ট ক্লাসের এক্সপেন্ডেবল টার্বো জেট ইঞ্জিন। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)-র অধীনস্থ, বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক গ্যাস টার্বাইন রিসার্চ এস্টাব্লিশমেন্ট (GTRE) এই ইঞ্জিনের নকশা তৈরি করেছে, আর হায়দরাবাদের বেসরকারি সংস্থা আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিং একে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

সরকার-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের ফসল

জেট ইঞ্জিন তৈরি বিশ্বের অন্যতম জটিল প্রযুক্তি হিসেবে গণ্য হয়। নিখুঁত মেশিনিং, উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধাতু এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় বলে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশই স্বাধীনভাবে এমন প্রপালশন সিস্টেম তৈরি করতে সক্ষম। সেই তালিকায় এবার নিজের জায়গা আরও পোক্ত করল ভারত।

গত ২২ জুলাই, ২০২৬ তারিখে এই ইঞ্জিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিইও রাকেশ চোপদার ইঞ্জিনটি তুলে দেন DRDO-র ডিরেক্টর জেনারেল (অ্যারোনটিক্যাল সিস্টেমস) ডঃ কে. রাজলক্ষ্মী মেনন এবং GTRE-র ডিরেক্টর ডঃ এস. ভি. রামানামূর্তির হাতে। বছরের পর বছর ধরে চলা গবেষণা, প্রকৌশল দক্ষতা এবং উন্নত উৎপাদন প্রক্রিয়ার মেলবন্ধনেই সম্ভব হয়েছে এই সাফল্য।

প্রতিরক্ষা সচিবের প্রতিক্রিয়া

এই সাফল্য নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রতিরক্ষা সচিব তথা DRDO-র চেয়ারম্যান রাজেশ কুমার সিং। তিনি GTRE এবং তার শিল্প অংশীদার আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দুই পক্ষের এই সহযোগিতাই দেশীয় এক্সপেন্ডেবল টার্বো জেট ইঞ্জিন তৈরির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে দেশের অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মাইলফলকে পরিণত করেছে।

মন্ত্রক জানিয়েছে, বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশই এই ধরনের জটিল ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছে, আর সেই তালিকায় নিজের স্থান করে নিল ভারত। এই ইঞ্জিন ভবিষ্যতে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতা আরও মজবুত করবে এবং সামরিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যপূরণে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

কোন কাজে লাগবে এই ইঞ্জিন

এটি একটি এক্সপেন্ডেবল বা স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের টার্বো জেট ইঞ্জিন, যা যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের জন্য তৈরি নয়। তবে এটি ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ মিসাইল, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং দীর্ঘ পাল্লার লোইটারিং মিউনিশনের (আত্মঘাতী ড্রোন জাতীয় অস্ত্র) মতো একক-অভিযান ব্যবহারের ক্ষেত্রে শক্তি জোগাতে সক্ষম। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস টার্বাইন ইঞ্জিনের জটিল প্রযুক্তি আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

চার দশকের যাত্রার প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, চার দশকেরও বেশি আগে দেশীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ভারত। ১৯৮০-র দশকে GTRE-র হাত ধরে শুরু হওয়া কাবেরী ইঞ্জিন প্রকল্প তেজস যুদ্ধবিমানকে শক্তি জোগানোর লক্ষ্যে তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট, ওজন ও নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কাবেরী প্রকল্প সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল না — এটি দেশীয় জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি, বিশেষায়িত পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং একটি প্রজন্মের ইঞ্জিনিয়ারকে জটিল অ্যারো-ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করার কাজ করেছিল। কাবেরী প্রকল্পের সেই ব্লুপ্রিন্টই এখন নিখুঁতভাবে তৈরি ব্লেড, কম্বাস্টর ও টারবাইন অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে বেসরকারি ভারতীয় শিল্পে বাস্তব রূপ পাচ্ছে বলে মনে করছেন প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিকরা।

বেসরকারি শিল্পের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষকদের মত

আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত জিই অ্যারোস্পেস, হানিওয়েল, রোলস-রয়েস, মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সিমেন্স এনার্জির মতো বিশ্বখ্যাত সংস্থার জন্য নিখুঁত রোটেটিং যন্ত্রাংশ তৈরির কাজে পরিচিত। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু টারবাইন ব্লেড তৈরি থেকে সম্পূর্ণ একটি দেশীয় ইঞ্জিন উৎপাদনে উত্তরণ ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন।

এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল অনিল গোলানি জানিয়েছেন, এই সহযোগিতা এখন দৃশ্যমান এবং তা শুধু একটি ৩৫০ কেজির ইঞ্জিন হস্তান্তরের চেয়েও অনেক বেশি কিছু বোঝায় — এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় শিল্প এখন অ্যারোস্পেস মানের সম্পূর্ণ প্রপালশন সিস্টেম তৈরিতে সক্ষম। তাঁর মতে, এবার লক্ষ্য হওয়া উচিত ১১০ থেকে ১২০ কিলোনিউটন ক্ষমতার দেশীয় অ্যারো-ইঞ্জিন প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ — AMCA ও উন্নত ইঞ্জিন প্রযুক্তি

ভারতের অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA)-র জন্য প্রয়োজন হবে ১২০ কিলোনিউটন ক্ষমতার এক অত্যাধুনিক ইঞ্জিন, যা এখনও পর্যন্ত ভারতের তৈরি যেকোনও ইঞ্জিনের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অ্যাডভান্সড হাই থ্রাস্ট ইঞ্জিন (AHTE) প্রকল্প চালু করার পাশাপাশি ফ্রান্সের সাফরান সংস্থার সঙ্গে যৌথ উন্নয়নের পথও খতিয়ে দেখছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তিগুলির তুলনায় এবার ভারতীয় আলোচকরা সিঙ্গল-ক্রিস্টাল টারবাইন ব্লেড, উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধাতু এবং থার্মাল ব্যারিয়ার কোটিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে প্রকৃত নকশা-জ্ঞান আদায়ের চেষ্টা করছেন — এই প্রযুক্তির অভাবই কাবেরী ইঞ্জিনকে কার্যকর হতে বাধা দিয়েছিল।

আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ

এই প্রকল্প ভারত সরকারের দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারি গবেষণা সংস্থা এবং বেসরকারি শিল্প — এই দুইয়ের মেলবন্ধন ভবিষ্যতে কৌশলগত অ্যারোস্পেস প্রকল্পগুলির জন্য মজবুত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরিতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ৩৫০ কেজি থ্রাস্ট ক্লাসের এই ইঞ্জিন কমপ্যাক্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রপালশন সিস্টেমের প্রয়োজন এমন ভবিষ্যৎ দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলিতে কাজে লাগবে, যা আমদানি করা প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমাবে।

উপসংহার

এই সাফল্য শুধু একটি প্রযুক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের এক জোরালো দৃষ্টান্ত। কাবেরী ইঞ্জিন প্রকল্পের চার দশকের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে আজকের এই ৩৫০ কেজি ইঞ্জিন হস্তান্তর পর্যন্ত — প্রতিটি ধাপই ভারতকে জটিল অ্যারো-ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে আরও পরিণত করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে আসল পরীক্ষা এখনও বাকি — AMCA-র জন্য প্রয়োজনীয় ১২০ কিলোনিউটন ক্ষমতার ইঞ্জিন তৈরি করাই হবে পরবর্তী বড় লক্ষ্য। তবু GTRE ও আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই যৌথ প্রয়াস স্পষ্ট করে দিল, উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে ভারতীয় সংস্থাগুলি বিশ্বমানের প্রযুক্তিও দেশেই তৈরি করতে সক্ষম।

Leave A Reply

Exit mobile version