সংক্ষিপ্ত সার: সজনে পাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে Vitamin A, Vitamin C, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং পটাশিয়াম। গবেষকদের মতে এই পাতা রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এবং হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে সজনে বীজের রয়েছে এক আশ্চর্য ক্ষমতা, তা হলো নোংরা জল পরিষ্কার করা। এই প্রতিবেদনে আমরা সজনের পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং ব্যবহারের সময় কী কী সতর্কতা মানা দরকার তা বিস্তারিত আলোচনা করব।
কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: আমাদের চারপাশে এমন অনেক গাছ আছে যাদের গুরুত্ব আমরা ঠিকমতো বুঝি না। সজনে বা Moringa oleifera তেমনই একটি গাছ। রান্নাঘরের তরকারি থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীদের গবেষণাগার, সজনে গাছের প্রায় প্রতিটি অংশ নিয়েই এখন আলোচনা চলছে। পাতা, ডাঁটা, বীজ সব কিছুরই আলাদা আলাদা উপযোগিতা আছে, আর এই কারণেই একে অনেকে Miracle Tree বলে থাকেন।
একটি গাছ, যার প্রতিটি অংশের আলাদা গল্প
ভারতের বেশিরভাগ গ্রাম বা মফস্বল শহরে হাঁটলেই আশেপাশে একটা সজনে গাছ চোখে পড়ে, যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। অথচ এই সাধারণ দেখতে গাছটিই এখন সারা বিশ্বের পুষ্টিবিদ এবং গবেষকদের নজর কাড়ছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, একই গাছের পাতা আর বীজ প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে লাগে। একটি শরীরকে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায়, অন্যটি মানুষের খাওয়ার জলকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের এই গাছ পরবর্তীতে আফ্রিকা এবং এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, মূলত এর নিত্যদিনের ব্যবহারিক গুরুত্বের কারণেই।
পাতায় কী এমন বিশেষত্ব আছে
সজনের খ্যাতির বড় অংশই আসে এর পাতা থেকে। এতে রয়েছে Vitamin A, Vitamin C এবং Vitamin E, সঙ্গে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফোলেট। এছাড়াও রয়েছে quercetin এবং chlorogenic acid এর মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। পুষ্টিবিদরা প্রায়ই বলেন, খুব কম পাতাযুক্ত সবজিতেই এই ধরনের সংমিশ্রণ একসঙ্গে পাওয়া যায়।
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায়: শরীরে অতিরিক্ত খারাপ কোলেস্টেরল বা LDL জমতে জমতে ধমনীতে ফলক তৈরি করে। সজনে পাতার কিছু উপাদান এই জমা হওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে এবং খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়, যার ফলে রক্তনালী সুস্থ থাকে।
রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা: পাতায় থাকা chlorogenic acid খাবার খাওয়ার পর রক্তে সুগার প্রবেশের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয় বলে মনে করা হয়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারে সজনে পাতার গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে সুগারের হঠাৎ বৃদ্ধি কম হয়, এবং ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতাও কিছুটা উন্নত হয়।
কোষের দৈনন্দিন ক্ষতি রোধে: শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, দূষণ এবং মানসিক চাপ থেকে তৈরি হওয়া ফ্রি র্যাডিক্যাল দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি করে। সজনে পাতায় থাকা quercetin এবং Vitamin C এর মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ক্ষতি কিছুটা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করা হয়, যদিও গবেষকরা বলছেন এই বিষয়ে মানুষের উপর করা গবেষণা এখনও সীমিত।
রক্তাল্পতা প্রতিরোধে সম্ভাব্য সহায়ক: পাতায় থাকা আয়রন এবং ফোলেট লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে, আর Vitamin C উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আয়রন শোষণ ভালো করে। কয়েকটি ছোট আকারের গবেষণায় নিয়মিত সজনে গ্রহণকারীদের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে, তবে এটি নিশ্চিত হতে বড় আকারের গবেষণার প্রয়োজন।

যে বীজ জল পরিষ্কার করে
পাতা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও, সজনে বীজেরও রয়েছে নিজস্ব এক অসাধারণ ক্ষমতা। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার শুষ্ক অঞ্চলের মানুষজন দীর্ঘদিন ধরে এই বীজ গুঁড়ো করে ঘোলা জলে মিশিয়ে ব্যবহার করে আসছেন। বীজের ভেতরের একটি প্রোটিন ধনাত্মক তড়িৎ আধান বহন করে, যা জলে ভাসমান ময়লা এবং ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের একসঙ্গে জমিয়ে তলায় বসিয়ে দেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জল লক্ষণীয়ভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়, এবং কিছু ফিল্ড স্টাডি অনুযায়ী এই জল পানের মূল মান পূরণ করতে সক্ষম হয়।
শুধু জল পরিষ্কার করাই নয়, বীজের আরও ব্যবহার আছে। কচি বীজ খাওয়া যায় এবং তাতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও প্রোটিন থাকে। বীজ চেপে তৈরি করা হয় বেন অয়েল নামের একটি হালকা তেল, যা রান্না এবং ত্বকের পরিচর্যায় ব্যবহৃত হয়। ত্বকের প্রাকৃতিক তেলের সঙ্গে গঠনগত মিল থাকায় এটি প্রায়ই ময়েশ্চারাইজিং কাজে ব্যবহৃত হয়, যা লোমকূপ বন্ধ করে না। বীজে থাকা কিছু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ ক্ষত সারাতেও কার্যকর হতে পারে বলে গবেষণায় উঠে আসছে।
মানুষ সজনে কীভাবে ব্যবহার করেন
ভারতীয় অধিকাংশ পরিবারে সজনে ইতিমধ্যেই কোনো না কোনো ভাবে খাবারের অংশ, যদিও অনেকেই এর পুষ্টিগুণ নিয়ে খুব একটা চিন্তা করেন না। লম্বা সবুজ ডাঁটা, যা সাধারণত সজনে ডাঁটা নামে পরিচিত, সম্বর এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক তরকারিতে ব্যবহৃত হয়। পাতা হালকা ভেজে বা ডাল ও সবজির পদে মিশিয়ে খাওয়া হয়, অনেকটা পালং শাকের মতোই। শুকনো পাতার গুঁড়োও একটি জনপ্রিয় বিকল্প, যা স্মুদি বা ঘোলে সহজেই মিশিয়ে নেওয়া যায়, তবে এর স্বাদ একটু মাটি ঘেঁষা হওয়ায় শুরুতে অল্প পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
সতর্কতার কথা
এত গুণাগুণ থাকা সত্ত্বেও, চিকিৎসকরা সজনেকে সব রোগের সমাধান হিসেবে দেখতে বারণ করেন। অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়, কারণ গাছের ছাল বা মূল থেকে তৈরি নির্যাস জরায়ুতে সংকোচন ঘটাতে পারে। থাইরয়েড, ডায়াবেটিস বা রক্তচাপের ওষুধ খাচ্ছেন এমন যে কারো উচিত সজনে সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, কারণ এটি এসব চিকিৎসার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, সজনে গাছ প্রকৃতির এক অসাধারণ উপহার, যার পাতা থেকে বীজ পর্যন্ত প্রতিটি অংশেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় সজনে রাখলে তা শরীরের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে, তবে এটিকে সব রোগের সমাধান ভাবা ঠিক নয়। বিশেষত গর্ভবতী মহিলা এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক পরিমাণে ও সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে এই ছোট্ট গাছটিই হয়ে উঠতে পারে সুস্থ জীবনযাপনের এক ভরসাযোগ্য সঙ্গী।

