সংক্ষিপ্ত সার
গরমের পর বৃষ্টি নামলে স্বস্তি মেলে ঠিকই, কিন্তু এই মরশুম সঙ্গে করে নিয়ে আসে জন্ডিস, টাইফয়েড, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো একাধিক রোগের ঝুঁকি। জমা জল আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ জীবাণু বংশবিস্তারের আদর্শ জায়গা হয়ে ওঠে। সঠিক সতর্কতা মেনে চললে বর্ষার আনন্দ উপভোগ করাও সম্ভব, রোগ এড়িয়ে চলাও সম্ভব।
কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক: বৃষ্টি নামলেই মন ভালো হয়ে যায়, গরম গরম ভাজাভুজি খাওয়ার ইচ্ছেও বেড়ে যায়। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে একাধিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। জমে থাকা বৃষ্টির জল আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস আর ছত্রাকের জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে, যার ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। শিশু, বয়স্ক, কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এবং ডায়াবেটিস বা ক্যানসারের রোগীদের জন্য এই মরশুম বাড়তি সতর্কতার দাবি রাখে।
জলবাহিত রোগের ঝুঁকি
বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি ছড়ায় জলবাহিত রোগ। জন্ডিস তার মধ্যে অন্যতম, যা লিভারের ভাইরাল সংক্রমণ থেকে হয় এবং দূষিত জলের মাধ্যমে ছড়ায়। এতে চোখ ও প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। দূষিত খাবার বা জল থেকে হওয়া ডায়রিয়াও এই সময়ে খুব সাধারণ, যা সাধারণত পর্যাপ্ত জল ও লবণ খাওয়ার মাধ্যমে সামলানো যায়, তবে গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে গিয়ে স্যালাইন বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে। টাইফয়েডও দূষিত খাবার ও জল থেকে ছড়ায়, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা আর পেটে ব্যথার সঙ্গে থাকে র্যাশ। এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি, কারণ এটি সংক্রামক।
ভাইরাল জ্বর ও পেটের সংক্রমণ
স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ভাইরাসের সক্রিয়তা বেড়ে যায়, ফলে সাধারণ সর্দিকাশি ও ভাইরাল জ্বর এই সময়ে খুব সাধারণ। দীর্ঘক্ষণ এসির ঠান্ডা বাতাসে থাকলে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনাও বাড়ে। জ্বর, সর্দি, গায়ে ব্যথার মতো উপসর্গে সাধারণত প্যারাসিটামল আর গরম তরল পানীয় স্বস্তি দেয়। হেপাটাইটিস এ রোগও দূষিত খাবার ও জল থেকে ছড়ায়, যাতে জ্বর, খিদে কমে যাওয়া, গা গোলানো আর চোখ হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এছাড়া দূষিত জলে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের কারণে গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস হতে পারে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হালকা হলেও কখনো কখনো গুরুতর রূপ নিতে পারে, তাই উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পোকামাকড়বাহিত রোগ
জমা নোংরা জলে হাঁটাচলা করলে, বিশেষত ত্বকে কোনো ক্ষত থাকলে লেপ্টোস্পাইরোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সংক্রমণ ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে জ্বর ও তীব্র গায়ে ব্যথার সৃষ্টি করে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায় এবং সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই সারানো সম্ভব। এই মরশুমে জলরোধী জুতো ব্যবহার করলে পা শুকনো থাকে, যা সংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে। এছাড়া মশার বংশবিস্তারের কারণে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগও এই সময়ে বাড়ে। নিয়মিত বিরতিতে কাঁপুনিসহ জ্বর হলে তা ম্যালেরিয়ার লক্ষণ হতে পারে। চিকুনগুনিয়ায় হঠাৎ তীব্র জ্বরের সঙ্গে গাঁটে গাঁটে ব্যথা আর পা ফুলে যাওয়া দেখা যায়। ডেঙ্গুতে মাথাব্যথা, কোমরে ব্যথা, গাঁটে তীব্র ব্যথা আর জ্বরের সঙ্গে রক্তে প্লেটলেট কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, গুরুতর ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে। এই দুটো রোগের এখনো নির্দিষ্ট কোনো টিকা না থাকায় ঘর মশামুক্ত রাখাই সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ।
ত্বকের সমস্যাও কম নয়
বর্ষাকালে ভেজা জামাকাপড়ের কারণে ত্বকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণ বেড়ে যায়। বগল, কুঁচকি বা পায়ের আঙুলের ফাঁকে ছত্রাকের সংক্রমণ সাধারণত বেশি দেখা যায়, যা অবহেলা করলে কখনো কখনো গুরুতর আকার নিতে পারে। ত্বক পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নিয়মিত ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করাও জরুরি, বিশেষত যারা দীর্ঘক্ষণ এসি ঘরে থাকেন তাদের জন্য।
সুস্থ থাকতে কী করবেন
প্রতিটি খাবার আগে হাত ধোয়া এবং সঙ্গে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা সংক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে। বাইরের খাবার এড়িয়ে বাড়িতে তৈরি টাটকা খাবার খাওয়াই ভালো। জল ফুটিয়ে বা পিউরিফায়ার দিয়ে ফিল্টার করে খাওয়া উচিত। মশার কামড় থেকে বাঁচতে শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং মশারি বা রিপেলেন্ট ব্যবহার করা জরুরি। বাইরে থেকে ফিরে গরম জলে স্নান করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা বাড়ে বলে মনে করা হয়। শিশুদের নোংরা জলে খেলতে দেওয়া উচিত নয়, আর কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢাকা জরুরি। প্রচুর পরিমাণে তাজা ফল ও সবুজ শাকসবজি খাওয়া উচিত। শুধু পরিষ্কার সুইমিং পুলেই সাঁতার কাটা উচিত, আর আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখা এবং জমা জল বা খোলা জলের ট্যাংক ঢেকে রাখাও মশার বংশবিস্তার রোধে সহায়ক।
জীবনযাত্রায় ছোট কিছু বদল আনুন
শুধু খাওয়াদাওয়া বা পরিচ্ছন্নতা নয়, দৈনন্দিন অভ্যাসের কিছু ছোট বদলও রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। বাজার থেকে কেনা ফল ও সবজি খাওয়ার আগে বহতা জলে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া উচিত, কারণ এদের গায়ে নানা জীবাণু লেগে থাকতে পারে। রাস্তার ধারে কাটা ফল বা স্যালাড এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। পর্যাপ্ত ঘুম, অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে, আর দেরি করে ঘুমানো বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস সর্দিকাশির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বৃষ্টির কারণে বাইরে হাঁটা বা দৌড়ানো কঠিন হলেও যোগব্যায়াম, স্কিপিং বা ঘরোয়া ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া উচিত, কারণ নিয়মিত শরীরচর্চা রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে এবং শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী করে। এছাড়া বারবার বৃষ্টিতে ভেজা এড়িয়ে চলাই ভালো, বাইরে বেরোনোর সময় ছাতা বা রেনকোট সঙ্গে রাখলে ভিজে যাওয়া এবং তার থেকে হওয়া অসুস্থতা অনেকটাই এড়ানো যায়।
উপসংহার
বর্ষা মানেই শুধু সুন্দর আবহাওয়া নয়, বরং একইসঙ্গে সতর্ক থাকারও সময়। শরীরে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সাধারণ কিছু সতর্কতা মেনে চললে বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি রোগ থেকেও দূরে থাকা সম্ভব।
ডিসক্লেমার: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য-তথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। লেখক চিকিৎসক নন এবং এটি চিকিৎসা পরামর্শ হিসেবে বিবেচিত হবে না। কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা বা উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

