সংক্ষিপ্ত সারাংশ: কেন্দ্রীয় সরকার RBI-কে ১০ ও ২০ টাকার পলিমার নোট মাঠ পরীক্ষার জন্য বাজারে ছাড়ার অনুমতি দিয়েছে, মোট ২০০ কোটি পিস নোট এই ট্রায়ালে থাকবে। প্রায় ১৪ বছর আগে থমকে যাওয়া এই পরিকল্পনা এবার নতুন করে এগোচ্ছে, মূলত খরচ কমানো, জাল নোট রোখা এবং পরিবেশগত সুবিধার কথা মাথায় রেখে। পলিমার নোট কাগজের নোটের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই এবং প্রায় ৬০টি দেশ ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, পুরনো কাগজের নোট বাতিল হচ্ছে না — দুটোই একসঙ্গে বাজারে চলবে।
অর্থনীতি ডেস্ক: আপনার মানিব্যাগে এবার হয়তো দেখা যাবে একেবারে অন্যরকম দেখতে টাকা — ছিঁড়বে না, ভিজলেও নষ্ট হবে না। ১০ এবং ২০ টাকার নোট এবার আসতে চলেছে পলিমার বা প্লাস্টিক উপাদানে তৈরি হয়ে। কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-কে এই দুই ছোট অঙ্কের নোট পলিমার প্রযুক্তিতে ছাপানোর অনুমতি দিয়েছে, আর সংসদেও এই বিষয়ে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। মজার বিষয় হল, এই পরিকল্পনা একেবারে নতুন নয় — প্রায় ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালেও একবার এমন পরিকল্পনা ঘোষণা হয়েছিল, তবে তখন তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সাধারণ কাগজের নোট থেকে কতটা আলাদা এই পলিমার নোট
এখনকার দিনে আমরা যে নোট ব্যবহার করি, তা তুলো থেকে পাওয়া লম্বা তন্তু দিয়ে তৈরি কাগজে ছাপা হয় — অর্থাৎ গাছ কেটে কাগজ তৈরির সঙ্গে এর সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। পলিমার নোট একেবারে ভিন্ন — এটি প্লাস্টিক জাতীয়, ছিদ্রহীন ও তন্তুবিহীন এক বিশেষ উপাদানে তৈরি হয়। এই কারণেই এগুলো সহজে ছিঁড়ে যায় না, জলে ভিজলেও নষ্ট হয় না এবং সাধারণ নোটের তুলনায় দুই থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি দিন টেকসই থাকতে পারে, যদিও এই স্থায়িত্ব নির্ভর করে নোটের অঙ্কের উপর।
সংসদে যা জানালেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী
লোকসভায় এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানান, RBI-র কেন্দ্রীয় পর্ষদের সুপারিশ অনুযায়ী ১০ ও ২০ টাকার পলিমার নোট মিলিয়ে মোট ২০০ কোটি পিস (১০০ কোটি করে দুই ধরনের নোট) মাঠ পরীক্ষার জন্য বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা সরকার অনুমোদন করেছে। পরীক্ষা সফল হলে তবেই নিয়মিতভাবে এই নোট ছাপানো শুরু হবে। মন্ত্রী আরও জানান, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে পলিমার নোটের আয়ুষ্কাল প্রচলিত কাগজের নোটের তুলনায় অনেক বেশি।
কেন এই সিদ্ধান্ত — টাকা বাঁচানোর অঙ্ক
প্রতি বছর নোট ছাপাতে সরকারের বিপুল খরচ হয়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ছাপানোর প্রয়োজন কমে যাওয়ায় RBI-র এই খাতে খরচ প্রায় ২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪,৮৭৫ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল ৬,৩৭৩ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বাজারে টাকার চাহিদা কমেনি — বরং ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষে দেশে প্রচলিত মুদ্রার মোট মূল্য বছরে ১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১.২৩ লক্ষ কোটি টাকায়, যার মধ্যে ৫০০ টাকার নোটের অংশীদারিত্বই প্রায় ৮৬ শতাংশ।
তবে ছোট অঙ্কের নোট, যেমন ১০ ও ২০ টাকা, হাতবদল হয় সবচেয়ে বেশি এবং তাই এগুলো সবচেয়ে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়। ফলে টেকসই পলিমার নোট চালু হলে বারবার ছাপানো, পরিবহণ ও পুরনো নোট নষ্ট করার খরচ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছে সরকার।
জাল নোট রুখতেও সহায়ক হতে পারে
RBI-র তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জাল নোট শনাক্তকরণের সংখ্যা বেড়েছে — আগের বছরের ২ লক্ষ ১৭ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার, যার মধ্যে ৫০০ টাকার জাল নোট বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০.৫ শতাংশ এবং ২০ টাকার নোটে প্রায় ৪৭.৪ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা বলছে, পলিমার নোট চালুর পর সেখানে জাল নোট ধরা পড়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কানাডাতেও পলিমার নোট চালুর পর জাল নোট প্রচলনের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে বলে তথ্য মিলেছে।
বিশ্বের কোন কোন দেশ ব্যবহার করে পলিমার নোট
অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলি ইতিমধ্যেই পলিমার নোট ব্যবহার করে। ভারতের কাছাকাছি থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও কিছু কিছু অঙ্কের নোট পলিমারে তৈরি হয়। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮৮ সালে এই ধরনের নোট চালু করেছিল, আর বর্তমানে প্রায় ৬০টির বেশি দেশ এই প্রযুক্তি কোনও না কোনও আকারে ব্যবহার করছে। কানাডা পরিবেশগত প্রভাব খতিয়ে দেখার পর ২০১১ সাল থেকে ধাপে ধাপে পলিমার নোটে রূপান্তরিত হয়।
পরিবেশের জন্যও ভালো, বলছে আন্তর্জাতিক গবেষণা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-র একটি গবেষণা অনুযায়ী, কাগজের নোটের তুলনায় পলিমার নোট তৈরির সামগ্রিক প্রক্রিয়া পরিবেশের জন্য অনেক বেশি সহায়ক। তুলো চাষ থেকে শুরু করে পুরনো নোট নষ্ট করা পর্যন্ত পুরো জীবনচক্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পলিমার নোট ব্যবহারে বিশ্ব উষ্ণায়নে প্রভাব প্রায় ৩২ শতাংশ এবং শক্তি খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কম হয়। পলিমার নোট কাগজের নোটের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সময় টিকে থাকে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। এছাড়া, পলিমার নোট হালকা হওয়ায় পরিবহণও তুলনামূলক সহজ হয়। মেয়াদ ফুরোনোর পর পলিমার নোট পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দ্রব্যে রূপান্তরিত করা যায়, যেখানে কাগজের নোট সাধারণত টুকরো টুকরো করে ল্যান্ডফিলে ফেলে দেওয়া হয়।
ডিমনিটাইজেশনের ভয় নেই, বলছে সরকার
অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি পুরনো কাগজের ১০ ও ২০ টাকার নোট বাতিল হয়ে যাবে? সরকার এই বিষয়ে সম্পূর্ণ স্পষ্ট — এটি কোনওভাবেই নোটবন্দির মতো পরিস্থিতি নয়। পুরনো কাগজের নোট এবং নতুন পলিমার নোট, দুটোই একসঙ্গে বাজারে চলবে। কাগজের নোট সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলার কোনও প্রস্তাব সরকারের নেই বলেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনে কী প্রভাব পড়বে
এই নতুন নোট আসার ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার কমে যাবে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানান, প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং নিয়মিত ইস্যু শুরু হওয়ার পরই এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে। তাঁর মতে, কাগজের নোট এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা একে অপরের পরিপূরক, দুটোই মানুষের কাছে উপলব্ধ থাকবে।
উপসংহার
দীর্ঘদিনের সেই চেনা কাগজের নোটের পাশাপাশি এবার হয়তো আমাদের হাতে উঠে আসতে চলেছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের, বেশি টেকসই পলিমার নোট। প্রায় দেড় দশক আগে থমকে যাওয়া এই পরিকল্পনা এবার নতুন করে বাস্তবায়নের পথে, আর তার পেছনে রয়েছে খরচ কমানো, জাল নোট রোখা এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানোর মতো একাধিক যুক্তিসঙ্গত কারণ। যদিও এখনই বড় কোনও পরিবর্তনের কথা ভাবার সময় আসেনি — গোটা প্রক্রিয়াটা এখনও ট্রায়াল পর্যায়ে, আর পুরনো নোট বাতিলের কোনও প্রশ্নই নেই। তবে বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশ যেখানে ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেখানে ভারতের এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের মুদ্রা ব্যবস্থায় একটি বড় ও দীর্ঘমেয়াদি বদল আসতে পারে।

