🟨 সংক্ষেপে: স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় আজ সন্ধ্যায় শুরু হচ্ছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস। ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৩,০০০ অ্যাথলিট ১০ দিনের এই ক্রীড়াযজ্ঞে অংশ নেবেন। ভারতের হয়ে বিভিন্ন ইভেন্টে লড়বেন ১২৫ জন ক্রীড়াবিদ। উদ্বোধনের আগেই মহিলাদের ৭৫ কেজি বক্সিংয়ে সেমিফাইনালে উঠে ভারতের প্রথম পদকের আশা জাগিয়েছেন অলিম্পিক পদকজয়ী লভলিনা বরগোহাঁই।
ক্রীড়া প্রতিবেদক: দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বাড়তে থাকা আয়োজন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের পর অবশেষে শুরু হচ্ছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমস। আজ সন্ধ্যায় স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বহু-ক্রীড়া প্রতিযোগিতার। আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই প্রতিযোগিতায় ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৩,০০০ অ্যাথলিট অংশ নেবেন। এবারের গেমসে মোট ২১৫টি স্বর্ণপদকের জন্য লড়াই হবে। আয়োজন আগের তুলনায় ছোট হলেও বিশ্বের নামী ক্রীড়াবিদদের উপস্থিতিতে উত্তেজনার কোনও কমতি নেই।
ভারতের জন্যও এবারের আসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২৫ সদস্যের ভারতীয় দল বিভিন্ন ইভেন্টে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। জ্যাভলিন তারকা নীরজ চোপড়া, অলিম্পিক পদকজয়ী ভারোত্তোলক মীরাবাই চানু এবং বক্সার লভলিনা বরগোহাঁই-সহ একাধিক তারকার দিকে নজর থাকবে ক্রীড়াপ্রেমীদের।
উদ্বোধনের আগেই ভারতের সুখবর
গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই ভারতের শিবিরে এসেছে ইতিবাচক খবর। মহিলাদের ৭৫ কেজি বক্সিং বিভাগে অলিম্পিক ব্রোঞ্জজয়ী লভলিনা বরগোহাঁই সরাসরি সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছেন। এই ওজন বিভাগে মাত্র পাঁচজন প্রতিযোগী থাকায় লভলিনা-সহ তিনজন বক্সার ‘বাই’ পেয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছেন। ফলে তিনি এখন পদক জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন। সেমিফাইনালে জয় পেলেই তাঁর সামনে খুলে যাবে সোনার লড়াইয়ের দরজা।
ভারতের নজর নীরজ, মীরাবাইদের উপর
এবারের গেমসে ভারতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে নীরজ চোপড়া। অলিম্পিক ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই জ্যাভলিন তারকার কাছ থেকে আবারও সোনার প্রত্যাশা রয়েছে। ভারোত্তোলনে মীরাবাই চানু, বক্সিংয়ে লভলিনা বরগোহাঁই, পাশাপাশি অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও একাধিক ভারতীয় ক্রীড়াবিদ পদকের দৌড়ে রয়েছেন। অভিজ্ঞ ও তরুণদের সমন্বয়ে গড়া ভারতীয় দল এবারও শক্তিশালী পারফরম্যান্সের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছে।
ভিক্টোরিয়া থেকে গ্লাসগো—যেভাবে বদলে গেল আয়োজক
২০২৬ সালের কমনওয়েলথ গেমস প্রথমে আয়োজন করার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের। কিন্তু প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভিক্টোরিয়া সরকার আয়োজন থেকে সরে দাঁড়ায়। সেই সিদ্ধান্তের পর কমনওয়েলথ গেমসের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠে যায়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো সীমিত পরিসরে গেমস আয়োজনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। মাত্র দেড় বছরের প্রস্তুতিতে শহরটি আবারও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে নিজেকে প্রস্তুত করেছে।
ছোট আয়োজন, কিন্তু গুরুত্বে কোনও কমতি নেই
২০২২ সালের বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ২০টি খেলায় পাঁচ হাজারেরও বেশি অ্যাথলিট অংশ নিয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,০০০-এ এবং প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে মাত্র ১০টি খেলায়। তবে এবারের আসরে রয়েছে কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত প্যারা স্পোর্টস কর্মসূচি। ১০টি খেলার মধ্যে ছয়টিতেই প্যারা ইভেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া গ্যাবন ও টোগোর অন্তর্ভুক্তির ফলে এবার রেকর্ড ৭৪টি দেশ ও অঞ্চল অংশ নিচ্ছে।
ব্যয় কমাতে একাধিক পরিবর্তন
গ্লাসগো ২০২৬-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা আয়োজন করা। এবার কোনও নতুন অ্যাথলিটস ভিলেজ তৈরি করা হয়নি। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা শহরের বিভিন্ন হোটেলে থাকবেন। প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে মাত্র চারটি ভেন্যুতে, যেগুলি গ্লাসগো শহরের মধ্যেই কাছাকাছি অবস্থিত। খরচ কমানোর জন্য হকি, রাগবি, ব্যাডমিন্টন, স্কোয়াশ, ডাইভিং, রোড সাইক্লিং এবং মাউন্টেন বাইকিংয়ের মতো একাধিক জনপ্রিয় খেলা এবারের সূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের সংস্করণে এই খেলাগুলি আবার ফিরতে পারে বলে জানিয়েছে কমনওয়েলথ স্পোর্ট।
বিশ্বের তারকাদের জমজমাট লড়াই
এবারের অন্যতম বড় আকর্ষণ স্কটল্যান্ডের জশ কের। সম্প্রতি তিনি ২৭ বছর পুরোনো মাইল দৌড়ের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে আলোচনায় এসেছেন। দীর্ঘ ৬০ বছর পর কমনওয়েলথ গেমসে ফিরছে মাইল রেস এবং সেই ইভেন্টে তিনিই অন্যতম সেরা দাবিদার। এছাড়া থাকছেন জামাইকার পাঁচবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এলেইন থম্পসন-হেরা, কানাডার আন্দ্রে ডি গ্রাস, জামাইকার শেরিকা জ্যাকসন, স্কটল্যান্ডের ইলিশ ম্যাককলগান, দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি সাঁতারু চ্যাড লে ক্লস এবং স্কটল্যান্ডের অলিম্পিক পদকজয়ী ডানকান স্কট।
অস্ট্রেলিয়ার দিকেও থাকবে নজর
গতবার বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ৬৭টি স্বর্ণপদক জিতে পদক তালিকার শীর্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়া। এবারও তারা অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে মাঠে নামছে। সাঁতারে মলি ও’ক্যালাহান, কাইল চালমার্স, ক্যাম ম্যাকইভয়, অ্যাথলেটিক্সে নিনা কেনেডি, জেস হল, ম্যাট ডেনি, ক্যামেরন মায়ার্স এবং জেমিমা মন্টাগদের দিকে নজর থাকবে। নেটবলেও বর্তমান বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয়ান দল ডায়মন্ডস শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে খেলবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও থাকছে চমক
আজ সন্ধ্যায় কিং চার্লস তৃতীয়ের উপস্থিতিতে গ্লাসগোর ওভো হাইড্রো অ্যারেনায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে গেমসের। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কেটি টানস্টল, টম ওয়াকার, ক্যালাম বিটি এবং নাথান ইভান্স। সমাপনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবেন ডেল্টা গুডরেম, সিম্পল মাইন্ডস, ভারতের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী শঙ্কর মহাদেবন এবং অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা। ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস ভারতের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় ভারতীয় সংস্কৃতিকেও বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ গ্লাসগো ২০২৬?
এবারের কমনওয়েলথ গেমস শুধু পদকের লড়াই নয়; এটি এই ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতার ভবিষ্যতেরও একটি পরীক্ষা। ক্রমশ বাড়তে থাকা আয়োজন ব্যয়ের কারণে বিশ্বের অনেক শহরই বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে আগ্রহ হারাচ্ছে। সেই কারণেই কমনওয়েলথ স্পোর্ট ‘গেমস রিসেট’ মডেলের মাধ্যমে কম খরচে, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনের নতুন ধারণা সামনে এনেছে। এই মডেল সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বেশি শহর কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। এদিকে দর্শকদের আগ্রহও এখনও যথেষ্ট রয়েছে। গ্লাসগোয় সাঁতার ও ভেলোড্রোমের টিকিট উদ্বোধনের কয়েক মাস আগেই প্রায় শেষ হয়ে যায়, যা এই প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দেয়।
উপসংহার
অনিশ্চয়তার মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন রূপে শুরু হচ্ছে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬। আয়োজন আগের তুলনায় ছোট হলেও এই আসরের গুরুত্ব মোটেও কম নয়। বিশ্বের সেরা ক্রীড়াবিদদের লড়াইয়ের পাশাপাশি ভারতের ১২৫ সদস্যের দলের দিকে থাকবে কোটি কোটি সমর্থকের নজর। উদ্বোধনের আগেই লভলিনা বরগোহাঁই ভারতের পদকের আশা বাড়িয়েছেন। এখন অপেক্ষা নীরজ চোপড়া, মীরাবাই চানু এবং অন্যান্য ভারতীয় তারকাদের পারফরম্যান্সের। একই সঙ্গে গ্লাসগো ২০২৬ প্রমাণ করতে পারে, সীমিত বাজেটেও সফলভাবে আন্তর্জাতিক বহু-ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন সম্ভব—আর সেটাই হয়তো কমনওয়েলথ গেমসের ভবিষ্যতের নতুন দিশা হয়ে উঠবে।

