নিজস্ব সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পথে বড় সাফল্য পেল দেশ। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) সফলভাবে পরীক্ষা করল স্বদেশি দীর্ঘপাল্লার ‘কুশ’ (Kusha) সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। ওডিশার উপকূলের এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে এই প্রথম উড়ান পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। এমন সময়ে এই সাফল্য এল, যখন ভারতের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
ডিআরডিও সফলভাবে স্বদেশি দীর্ঘপাল্লার ‘কুশ’ এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রথম উড়ান পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশ হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম এই ব্যবস্থা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সাফল্য দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও আত্মনির্ভরতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং পরীক্ষার সাফল্যের কথা জানিয়ে বলেন, অত্যাধুনিক এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন (UAV), বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত্রুপক্ষের বড় সামরিক বিমানকে বিস্তৃত দূরত্ব ও উচ্চতায় প্রতিহত করতে সক্ষম। তিনি ডিআরডিও এবং প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিল্প সহযোগীদের অভিনন্দন জানান।
মন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির প্রযুক্তি বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের কাছেই রয়েছে। এই সফল পরীক্ষা ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কী এই ‘কুশ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা?
‘কুশ’ একটি অত্যাধুনিক Long-Range Surface-to-Air Missile (LRSAM) ব্যবস্থা, যা শত্রুপক্ষের বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি শনাক্ত করে দ্রুত ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং বড় সামরিক বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ফায়ার কন্ট্রোল প্রযুক্তি—সবকিছুই ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে। ফলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

কত দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে পারবে?
বর্তমান পরীক্ষায় ব্যবহৃত M1 ভ্যারিয়েন্ট প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম। তবে ‘প্রজেক্ট কুশ’-এর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি হচ্ছে, যার সর্বোচ্চ পাল্লা ভবিষ্যতে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
এই বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন উচ্চতা ও দূরত্বে একাধিক আকাশ হুমকি একসঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
S-400-এর দেশীয় বিকল্প গড়ার পথে বড় পদক্ষেপ
ভারত বর্তমানে রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক S-400 আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব প্রযুক্তিতে একই ধরনের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ‘প্রজেক্ট কুশ’-এর অন্যতম লক্ষ্য।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ‘কুশ’ সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হলে এটি S-400-এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং ভারতের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
কেন এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ?
এই সফল পরীক্ষা শুধু একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ নয়, বরং ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণার সক্ষমতারও বড় প্রমাণ। বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশই নিজস্ব প্রযুক্তিতে দীর্ঘপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। সেই তালিকায় ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হল।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। পাকিস্তানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান সক্ষমতার উন্নতি এবং চীনের আধুনিক যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ভারত ধাপে ধাপে একটি শক্তিশালী দেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলছে। সেই বৃহত্তর কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘কুশ’ প্রকল্প।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই পরীক্ষাকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেনি। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এর মূল লক্ষ্য ভারতের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা অর্জন।
আত্মনির্ভর ভারতের পথে বড় সাফল্য
‘কুশ’ প্রকল্প ভারতের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রকল্পে ডিআরডিওর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি শিল্প সংস্থা কাজ করছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই ধরনের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষণ
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ড্রোন, স্টেলথ যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার আকাশ হামলা এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। এই বাস্তবতায় শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘কুশ’ প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে এটি ভারতের বিদ্যমান S-400 ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং চীন ও পাকিস্তান থেকে সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের আকাশ হুমকি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একই সঙ্গে দেশীয় গবেষণা, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পেও এই প্রকল্প নতুন গতি আনবে।
উপসংহার
ডিআরডিওর ‘কুশ’ দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম সফল উড়ান পরীক্ষা ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পরীক্ষা নয়, বরং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরও প্রতিফলন। আগামী দিনে প্রকল্পের বিভিন্ন সংস্করণ সফলভাবে পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত হলে ভারতের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ‘কুশ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

