Tuesday, August 18, 2026

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মুক্ত ও উন্মুক্ত ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতি ফের ঝালিয়ে নিল ভারত ও জাপান। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষোড়শ ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম ভারত সফর। তবে এই প্রতিশ্রুতি এমন একটা সময়ে এল, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণাটিই তার সবচেয়ে বড় সমর্থক শক্তিকে হারানোর মুখে বলে মনে করা হচ্ছে।

পেন্টাগনের সিদ্ধান্তে নতুন জল্পনা

গত ১৬ জুন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক তাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম বদলে ফের ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা ২০১৮ সালে করা একটি পরিবর্তনকে উল্টে দিল। ২০১৮ সালে এই কমান্ডের নামকরণ প্রতীকী হলেও তা এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং মার্কিন কৌশলে ভারতের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এখন সেই সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থ, ওয়াশিংটনের কাছে এই অঞ্চলের গুরুত্ব আগের মতো নেই।

২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথিতেও ইন্দো-প্যাসিফিকের বদলে পশ্চিম গোলার্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, আর কোয়াড নিয়ে সেখানে সামান্যই উল্লেখ রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই অবস্থান বেজিংয়ের দীর্ঘদিনের আপত্তিকেই কার্যত মান্যতা দিচ্ছে। চিনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বদল স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কোয়াডকে ঘিরে পুরনো প্রশ্ন, নতুন উদ্বেগ

আমেরিকা এই ধারণা থেকে সরে দাঁড়ালে, তার উপর নির্মিত মঞ্চ কোয়াডের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আর এই নতুন আশঙ্কা যুক্ত হয়েছে আগে থেকেই থাকা কিছু সংশয়ের সঙ্গে— কোয়াড কতটা কার্যকর, নাকি এটি নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় নয়।

সমালোচকদের প্রথম অভিযোগ, কোয়াড কখনওই সরাসরি চিনের নাম নিয়ে সমালোচনা করে না। অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাই যদি লক্ষ্য হয়, তবে বেজিংয়ের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন নিয়ে নীরবতা ভাল বার্তা দেয় না বলে মত তাঁদের। যদিও এটি অনেকটাই নীতিগত সমালোচনা— যুক্তি দেওয়া যায় যে, কোয়াড নিজেকে সরাসরি চিন-বিরোধী মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরলে ছোট দেশগুলি এর সঙ্গে যুক্ত হতে দ্বিধা করতে পারে।

দ্বিতীয় সমালোচনা, কোয়াড নিজেকে নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরতে ইতস্তত করছে। চিন যেহেতু অঞ্চলে কঠিন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তাই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাও মূলত নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক হওয়া উচিত বলে মনে করেন সমালোচকেরা। কোয়াড এবং কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কিউএসডি)-কে সদস্য দেশগুলি সচেতনভাবে আলাদা রাখার চেষ্টা করে, যদিও ২০০৪ সালের প্রথম কিউএসডি থেকেই কোয়াডের সূচনা বলে সকলে স্বীকার করেন।

কোয়াডকে দ্বিপাক্ষিক ‘২+২’ পর্যায়ে (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের যৌথ বৈঠক) নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অনীহা দেখা গিয়েছে। চার দেশ পরস্পরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে ‘২+২’ বৈঠক প্রাতিষ্ঠানিক করলেও, কোয়াডের বৈঠক এখনও শুধু রাষ্ট্রনেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।

সহযোগিতার ক্ষেত্র ও অর্থবরাদ্দে ফারাক

কোয়াড মূলত অ-নিরাপত্তা বা ‘নরম’ বিষয়ের উপর জোর দেয় বলেও একটি অভিযোগ রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা আলাদা। ২০১৭ সালে বর্তমান কাঠামোয় গঠিত হলেও, শুরুর চার বছর কোয়াড কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। ২০২১ সালে কোভিড অতিমারির সময়ে প্রথম ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এটি সক্রিয় হয়, আর ছয় মাসের মধ্যেই প্রথম সরাসরি শীর্ষ বৈঠক হয়। এখন কোয়াডের সহযোগিতার তালিকায় রয়েছে মোট ৩৭টি ক্ষেত্র, যার মধ্যে ২৩টিই নিরাপত্তা সংক্রান্ত— প্রযুক্তি সার্বভৌমত্ব, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা যার মধ্যে অন্যতম, যা আগামী দিনে চিনকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রগুলির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোয়াডের মূল জোর তথ্য আদান-প্রদান, নজরদারি, ত্রাণ এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের উপরেই সীমাবদ্ধ। যদিও এগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোয়াডের এই সমন্বয় প্রচেষ্টা মূলত অসামরিক ব্যবহারের মধ্যেই আটকে রয়েছে— যদিও এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে সামরিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব।

সবচেয়ে বড় ফারাক অবশ্য দেখা যাচ্ছে অর্থবরাদ্দে। কোয়াডের নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক এজেন্ডার সঙ্গে তার তহবিল বণ্টনের কোনও সামঞ্জস্য নেই। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু খাতেই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্যোগগুলি মূলত মান নির্ধারণ ও সমন্বয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি বলে সেখানে বড় অঙ্কের তহবিলের প্রয়োজন কম। কিন্তু সহনশীল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে হলে বড় মাপের পুঁজি বিনিয়োগ অপরিহার্য, আর সেখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি ধরা পড়ছে।

২০০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি, তবে বাস্তবায়ন অনিশ্চিত

সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উদ্যোগ ও কাঠামো খাতে ২০০০ কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার তহবিল সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোয়াড, যা পরিস্থিতি কিছুটা বদলে দিতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এটি শুধু একটি লক্ষ্যমাত্রা হিসেবেই রয়ে গিয়েছে— কোনও প্রকৃত অর্থ বরাদ্দ বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়নি। কোয়াডের মোট উদ্যোগের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত হয়, তবে তহবিল বণ্টনেও সেই অনুপাত প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

শেষ পর্যন্ত কোয়াডের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের মীমাংসা ওয়াশিংটনের কোনও কমান্ডের নামকরণ পরিবর্তনে হবে না। বরং তা নির্ভর করবে এই বিষয়ের উপর যে, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক এজেন্ডাকে বাস্তবে কতটা আর্থিক সহায়তা দিয়ে সমর্থন করা হয়।


সৌজন্যে: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন অবলম্বনে

Leave A Reply

Exit mobile version