Tuesday, August 18, 2026
চার উপসাগরীয় দেশ সফরে জ্বালানি নিরাপত্তাই ছিল মূল আলোচ্য বিষয়, জানাল বিদেশ মন্ত্রক

চলতি মাসে কাতার, কুয়েত, বাহরিন এবং ওমান— এই চার উপসাগরীয় দেশ সফর করেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেই সফরের বিস্তারিত তথ্য জানাতে গিয়ে সোমবার সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, প্রতিটি দেশেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে।

চার দেশেই শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক

মুখপাত্রের কথায়, চার দেশেই নিজ নিজ প্রতিপক্ষ বিদেশমন্ত্রীর পাশাপাশি শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জয়শঙ্কর। বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বিনিয়োগের মতো পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একাধিক বিষয়ে কথা হয়েছে। জয়সওয়ালের বক্তব্য, জ্বালানি প্রসঙ্গ ছিল আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর সেই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ায় ঘটে চলা পরিস্থিতি নিয়েও নিজেদের মতামত বিনিময় করেছেন দুই পক্ষ।

কাতারে মধ্যস্থতার ভূমিকার প্রশংসা

সফরের প্রথম পর্বে কাতারে গিয়ে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জনসংযোগ— এই সব ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক পর্যালোচনা করেন দুই নেতা। আঞ্চলিক এবং বহুপাক্ষিক একাধিক বিষয় নিয়েও কথা হয় তাঁদের মধ্যে।

আমেরিকা-ইরান আলোচনায় কাতারের সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। এ ছাড়া, কাতারে বসবাসকারী ভারতীয় প্রবাসীদের সঙ্গেও দেখা করেন তিনি, এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কঠিন সময়ে তাঁদের সহনশীলতা এবং ভারত-কাতার অংশীদারি আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার প্রশংসা করেন।

বাহরিনে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ

৬ থেকে ৭ জুলাই বাহরিন সফরে গিয়ে সে দেশের রাজা হামাদ বিন ইসা আল খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। সেই সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স সলমন বিন হামাদ আল খলিফাও। বাহরিনের বিদেশমন্ত্রী ডঃ আবদুল লতিফ বিন রশিদ আল জ়ায়ানির সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি, যেখানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত করার সম্ভাব্য পথ নিয়েও আলোচনা হয়।

ওমানে কৌশলগত অংশীদারি পর্যালোচনা

১০ জুলাই ওমান সফরে গিয়ে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ বদর আলবুসাইদির সঙ্গে বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। ভারত-ওমান কৌশলগত অংশীদারির সামগ্রিক পর্যালোচনা করেন দুই মন্ত্রী, পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হয় তাঁদের মধ্যে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় নাবিকদের প্রতি ওমান সরকারের তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী।

কুয়েতেও নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক

সফরের শেষ পর্বে কুয়েতে গিয়ে সে দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। ভারত-কুয়েত কৌশলগত অংশীদারির অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন দুই পক্ষ।

সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের জ্বালানি সুরক্ষা এবং কৌশলগত অংশীদারি জোরদার করার লক্ষ্যেই এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে বিদেশ মন্ত্রক।

দেশের ভিতরেও জ্বালানি সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ

শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোই নয়, নিজস্ব নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ক্ষমতা বাড়িয়েও জ্বালানি সুরক্ষা মজবুত করার পথে এগোচ্ছে ভারত। কেন্দ্রীয় নতুন ও নবীকরণযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি ক্ষমতা পৌঁছেছে ২১৭.৬২ গিগাওয়াটে।

সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। ২০১৬ সালের মার্চে যেখানে দেশের মোট সৌরবিদ্যুৎ ক্ষমতা ছিল মাত্র ৯.০১ গিগাওয়াট, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭.৮৬ গিগাওয়াটে— অর্থাৎ প্রায় সাড়ে দশ গুণ বৃদ্ধি। এই সময়ে সৌর পার্কের সংখ্যাও ৩৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৮, আর ছাদে বসানো সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষমতা ৯০.৮ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে পৌঁছেছে সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।

বায়ুবিদ্যুতেও একই রকম উন্নতি দেখা গিয়েছে। ২০২০ সালে চালু হওয়া ‘সিসিডিসি উইন্ড ইনিশিয়েটিভ’-এর হাত ধরে দেশ জুড়ে ৮০০-রও বেশি বায়ু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বসিয়েছে জাতীয় বায়ুশক্তি সংস্থা (এনআইডব্লিউই)। এর ফলে ২০০৪ সালের ১.৮৬ গিগাওয়াট থেকে বায়ুবিদ্যুৎ ক্ষমতা বেড়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৪৮.১৬ গিগাওয়াটে। ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা দেশের প্রথম সমুদ্রতীরবর্তী (অফশোর) বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৭৪৫৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও অনুমোদন করেছে, যার আওতায় গুজরাত ও তামিলনাড়ু উপকূলে ৫০০ মেগাওয়াট করে মোট ১ গিগাওয়াট ক্ষমতা তৈরি হবে।

সবুজ হাইড্রোজেনে বিনিয়োগের লক্ষ্য আট লক্ষ কোটি টাকা

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চালু হওয়া জাতীয় সবুজ হাইড্রোজেন মিশনের লক্ষ্য, ভারতকে হাইড্রোজেন জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানিতে বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এই মিশনে মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা আট লক্ষ কোটি টাকারও বেশি, আর ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় ছয় লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনটি হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বার্ষিক ৪.১২ লক্ষ টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের বরাত দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সংস্থাকে।

কৃষক ও সাধারণ পরিবারের জন্য সৌরশক্তি প্রকল্প

পিএম-কুসুম প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহ দিচ্ছে সরকার, যেখানে মোট খরচের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশ জুড়ে প্রায় ৬.১ লক্ষ সৌর পাম্প বসানো হয়েছে, যা ২০২১ সালের ৩.৩ লক্ষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া পিএম সূর্যঘর মুফত বিজলি যোজনা বিশ্বের বৃহত্তম গৃহস্থালি ছাদ-সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত, যার লক্ষ্য ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে এক কোটি পরিবারকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা। প্রকল্প চালুর প্রথম দশ মাসেই প্রায় সাত লক্ষ বাড়িতে সৌর প্যানেল বসানো সম্পন্ন হয়েছে— যা মাসিক গড়ে প্রায় ৭০ হাজার স্থাপনার সমান, প্রকল্প শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। উপকৃত পরিবারগুলির বিদ্যুৎ বিলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে। গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কেরল এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি এই প্রকল্প রূপায়ণে বিশেষ অগ্রগতি দেখিয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিদেশ নীতির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি দেশীয় নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ক্ষমতা বৃদ্ধি— এই দুই পথেই একযোগে এগোচ্ছে ভারতের জ্বালানি সুরক্ষা কৌশল।


সৌজন্যে: সংবাদসংস্থা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অবলম্বনে

Leave A Reply

Exit mobile version