Tuesday, August 18, 2026

সংক্ষিপ্ত সার PhD করতে চাওয়া গবেষকদের জন্য সুখবর। এতদিন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা নিত, যার ফলে একাধিক পরীক্ষায় বসতে হত পড়ুয়াদের। এবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, রাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ আর নিজস্ব প্রবেশিকা নেবে না। বদলে UGC NET, CSIR NET, GATE বা CEED এর মতো জাতীয় স্তরের পরীক্ষার নম্বরেই মিলবে PhD প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ।

চাকরি ও শিক্ষা প্রতিবেদক: গবেষণায় আগ্রহী কোনো ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা বললেই একটা অভিযোগ বারবার উঠে আসত, একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে দিতে বছর পার হয়ে যাচ্ছে। কেউ কলকাতার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিতে গিয়েছেন তো পরের সপ্তাহেই অন্য রাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার জন্য ছুটতে হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষার আলাদা সিলেবাস, আলাদা ফি, আলাদা প্রস্তুতি। এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া এবার অতীত হতে চলেছে।

রাজ্যের নতুন নির্দেশিকা কী বলছে

গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের বিকাশ ভবন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি জারি হয়েছে। রাজ্যের সিনিয়র স্পেশাল সেক্রেটারির স্বাক্ষরে পাঠানো এই নির্দেশিকা রাজ্যের সব সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধ্যক্ষদের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা করে PhD Admission Test বা Research Entrance Test আয়োজন করতে পারবে না। বদলে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে UGC NET, CSIR NET, GATE, CEED বা এই ধরনের অন্যান্য জাতীয় স্তরের পরীক্ষার নম্বরকেই ভর্তির মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এবং ২০২২ সালের UGC রেগুলেশনকে। রাজ্যের নির্দেশিকায় স্বীকার করা হয়েছে যে আলাদা আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষার কারণে গবেষণায় আগ্রহী ছাত্রছাত্রীদের যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।

পিএইচডি ভর্তির নতুন কাঠামো ব্যাখ্যা করা এই ইনফোগ্রাফিকে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষার পরিবর্তে ইউজিসি নেট, গেট ও সিইইডি ভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা, ৭০ ৩০ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং তিনটি যোগ্যতা বিভাগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ছবির উৎস: The Kolkata Herald | Infographic based on UGC Guidelines.
কেন্দ্রীয় স্তরে এই পরিবর্তনের সূচনা কীভাবে হল

আসলে এই পরিবর্তনের বীজ বপন হয়েছিল আরও আগে। ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ UGC এর ৫৭৮তম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে NET স্কোরকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে। UGC এর সচিব অধ্যাপক মনিষ আর জোশির সই করা একটি চিঠিও দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া ছিল। এতদিন রাজ্যস্তরে এই নির্দেশ পুরোপুরি কার্যকর না হলেও এবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজস্ব আদেশ জারি করে বিষয়টিকে বাস্তবায়িত করল।

তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ হবে ফলাফল

নতুন ব্যবস্থায় NET পরীক্ষার ফলাফল আর শুধু উত্তীর্ণ বা অনুত্তীর্ণ এই দুই ভাগে থাকছে না। জুন ২০২৪ থেকে প্রার্থীদের নম্বরের পাশাপাশি পার্সেন্টাইলও জানানো হচ্ছে এবং তাদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হচ্ছে।

Category 1 এ থাকা প্রার্থীরা JRF ফেলোশিপ, PhD প্রোগ্রামে ভর্তি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের জন্য যোগ্যতা তিনটিই পান। Category 2 তে থাকা প্রার্থীরা JRF না পেলেও PhD ভর্তি ও অধ্যাপনার যোগ্যতা পান। আর Category 3 সবচেয়ে নতুন সংযোজন, যেখানে প্রার্থীরা শুধু PhD প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হন, ফেলোশিপ বা অধ্যাপনার যোগ্যতা না থাকলেও। এর ফলে অনেক মেধাবী গবেষক, যারা আগে ফেলোশিপ বা টিচিং এলিজিবিলিটির কাট অফ মিস করে হতাশ হতেন, তারাও এবার গবেষণার সুযোগ পাবেন।

সত্তর তিরিশ সূত্র, কীভাবে হবে মূল্যায়ন

Category 1 এর প্রার্থীরা সরাসরি ইন্টারভিউয়ের ভিত্তিতে ভর্তি হন। কিন্তু Category 2 ও Category 3 এর প্রার্থীদের জন্য একটা নির্দিষ্ট সূত্র ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কমে। এই সূত্র অনুযায়ী NET, GATE বা CEED এর মতো জাতীয় পরীক্ষার স্কোরের ওপর সত্তর শতাংশ ওয়েটেজ দেওয়া হবে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারভিউ বা ভাইভা ভোসের ওপর দেওয়া হবে বাকি তিরিশ শতাংশ। অর্থাৎ একজন প্রার্থীর চূড়ান্ত মেধাতালিকা তৈরি হবে জাতীয় পরীক্ষার নম্বর আর ইন্টারভিউয়ের নম্বরের সম্মিলিত ফলাফলে, যাতে শুধু ইন্টারভিউয়ের ওপর নির্ভর করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ঘুরে না যায়।

এক বছরের মেয়াদ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ

তবে এই সুবিধার সঙ্গে একটা শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। Category 2 ও Category 3 এর প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর PhD ভর্তির জন্য মাত্র এক বছরের জন্য বৈধ থাকবে। অর্থাৎ ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সময়ের কাঁটা ঘুরতে শুরু করে দেয়। এই এক বছরের মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে না পারলে আবার নতুন করে পরীক্ষায় বসতে হবে, তা যত ভালো নম্বরই আগে পেয়ে থাকুন না কেন। তাই যারা আগামী শিক্ষাবর্ষে গবেষণা শুরু করতে চান, তাদের উচিত ফলাফলের অপেক্ষা না করে গবেষণা প্রস্তাব, বিষয় নির্বাচন আর সম্ভাব্য গাইড খোঁজার কাজটা আগে থেকেই শুরু করে রাখা।

উপসংহার

দীর্ঘদিনের একাধিক পরীক্ষার ঝক্কি থেকে গবেষণায় আগ্রহী ছাত্রছাত্রীদের মুক্তি দেওয়ার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে স্বাগত জানানোর মতো। প্রশাসনিক জটিলতা আর আর্থিক বোঝা কমিয়ে একটাই জাতীয় মানদণ্ডে সবাইকে বিচার করার এই সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতার দিক থেকে বড় পদক্ষেপ। তবে একটাই দেশজোড়া প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শুধু ভর্তি হওয়ার লড়াই মিটে যাওয়ার পর এবার আসল প্রশ্ন উঠবে, দেশের গবেষণার মানই বা কতটা এগোবে।

Leave A Reply

Exit mobile version