Tuesday, August 18, 2026

নিজস্ব সংবাদদাতা: কর্নাটকের কারওয়ার নৌঘাঁটিতে বুধবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল ভারতীয় নৌসেনা। দেশীয়ভাবে নির্মিত মাহে-শ্রেণির অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্র্যাফট (এএসডব্লিউ-এসডব্লিউসি) সিরিজের দ্বিতীয় জাহাজ আইএনএস মালভান আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবহরে যুক্ত হল। এই সংযোজন ভারতের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং ডুবোজাহাজ-বিরোধী যুদ্ধক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কমিশনিং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং, সঙ্গে ছিলেন পশ্চিম নৌ কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল সঞ্জয় ভাটসায়ন, কোচিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের প্রতিনিধি এবং একাধিক প্রবীণ নৌ আধিকারিক।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে যা বললেন বায়ুসেনা প্রধান

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এয়ার চিফ মার্শাল সিং সামুদ্রিক নিরাপত্তার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তাঁর কথায়, বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাই একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, আর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই নিরাপত্তা বজায় রাখতে ভারতীয় নৌসেনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধজাহাজে ৮০ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমেই আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে তিনি এও বলেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বনির্ভরতার এই মন্ত্র নৌসেনা শুরু থেকেই আঁকড়ে ধরেছে, যেখানে বায়ুসেনা এই পথে অনেক পরে হেঁটেছে—এবং অন্য বাহিনীগুলিরও নৌসেনার এই মডেল থেকে শেখা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভাইস অ্যাডমিরাল ভাটসায়ন জানান, আইএনএস মালভান কারওয়ারে কমিশন্ড হওয়া প্রথম ভারতীয় রণতরী, এবং চলতি বছরে নৌসেনায় যুক্ত হওয়া সপ্তম যুদ্ধজাহাজ এটি। তাঁর কথায়, প্রতি ৪০ দিনে একটি নতুন জাহাজ বা প্ল্যাটফর্ম নৌবহরে যুক্ত হচ্ছে এই মুহূর্তে, এবং আরও ১২টি জাহাজ শীঘ্রই যুক্ত হতে চলেছে।

কোচিন শিপইয়ার্ডের কারিগরি দক্ষতার প্রতিফলন

কোচিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড কর্তৃক নির্মিত এই যুদ্ধজাহাজ ইতিমধ্যেই গত ৩১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ভারতীয় নৌসেনার হাতে হস্তান্তরিত হয়েছিল কোচিতে। নরওয়ের ডেট নরস্ক ভেরিটাস (ডিএনভি)-এর শ্রেণিবিন্যাস নিয়ম মেনে নির্মিত এই জাহাজ পানির নিচে নজরদারি, উদ্ধারকাজ এবং স্বল্প-তীব্রতার সামুদ্রিক অভিযানের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।

৭৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এই জাহাজ ডিজেল ইঞ্জিন-ওয়াটারজেট প্রপালশন প্রযুক্তিতে চালিত ভারতীয় নৌসেনার বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ। প্রথাগত প্রপেলারের বদলে ওয়াটারজেট প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জাহাজটি প্রায় নিঃশব্দে চলাচল করতে পারে, যা অগভীর জলে শত্রু ডুবোজাহাজ শনাক্তকরণে বিশেষ সুবিধা দেয়। মাত্র ২.৭ মিটার গভীরতাতেই চলাচল করতে সক্ষম এই জাহাজ উপকূলীয় শেলফ, নদীমুখ এবং দ্বীপপুঞ্জের অগভীর জলেও অনায়াসে অভিযান চালাতে পারবে।

অস্ত্রশস্ত্র ও সেন্সর ব্যবস্থা

আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও (প্রায় ১,১০০ টন) আইএনএস মালভানের অস্ত্রভাণ্ডার যথেষ্ট শক্তিশালী। জাহাজে রয়েছে আরবিইউ-৬০০০ অ্যান্টি-সাবমেরিন রকেট লঞ্চার, ডিআরডিও-নির্মিত হালকা টর্পেডো, মাইন স্থাপনের ব্যবস্থা, ৩০ মিলিমিটার নৌ কামান এবং দুটি রিমোট-কন্ট্রোলড স্টেবিলাইজড মেশিনগান। এছাড়া রয়েছে জার্মান-ভারতীয় যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত সোনার ব্যবস্থা এবং মাহিন্দ্রা ডিফেন্স সিস্টেমস নির্মিত ডিকয় লঞ্চারসহ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, যা শত্রুপক্ষের টর্পেডো বিভ্রান্ত করতে সক্ষম।

ভারতীয় নৌবাহিনীর দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত INS Malvan-এর এই ইনফোগ্রাফিকে যুদ্ধজাহাজটির প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন, অস্ত্র ব্যবস্থা, সোনার প্রযুক্তি, মিশন, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ছবির উৎস: ইনফোগ্রাফিক ডিজাইন কলকাতা হেরাল্ড ডট কম ডেস্ক
কেন এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোজন

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ডুবোজাহাজ কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে আইএনএস মালভানের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। চিনা নৌসেনা নিয়মিতভাবে ইউয়ান-শ্রেণির এআইপি সজ্জিত ডিজেল-বৈদ্যুতিক সাবমেরিন এবং পারমাণবিক আক্রমণকারী সাবমেরিন দিয়ে মালাক্কা, সুন্দা ও লম্বক প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ পর্যবেক্ষণ করে থাকে, পাশাপাশি আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি ভারতীয় নৌবহরের গতিবিধির ওপরও নজর রাখে। অগভীর উপকূলীয় জলে তাপীয় স্তর ও জটিল সমুদ্রতলের গঠনের কারণে গভীর জলের সোনার প্রযুক্তি কার্যকারিতা হারায়—আর ঠিক এই “ছায়া অঞ্চল”গুলিতেই নজরদারি চালাতে সক্ষম আইএনএস মালভানের মতো জাহাজ।

অন্যদিকে পাকিস্তান চিনের সহযোগিতায় আটটি হাঙ্গোর-শ্রেণির সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করছে, যেগুলি এআইপি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এবং বাবর-৩ ক্রুজ মিসাইল বহনে সক্ষম। এই সাবমেরিনগুলি মূলত মাকরান উপকূল, কচ্ছ উপসাগর এবং আরব সাগরের অগভীর জলে নিঃশব্দ অভিযানের জন্য তৈরি। পশ্চিম নৌ কমান্ডের অধীনে কারওয়ারে মোতায়েন থাকা আইএনএস মালভান এই পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় জলসীমা পাহারা দেওয়ার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ

আইএনএস মালভান আসলে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ অনুমোদিত ১৬টি জাহাজের বৃহত্তর এএসডব্লিউ-এসডব্লিউসি প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ১৯৮৯-৯১ সালের মধ্যে নৌবহরে যুক্ত হওয়া পুরনো অভয়-শ্রেণির করভেটগুলি প্রতিস্থাপন করা। এই প্রকল্পের আটটি মাহে-শ্রেণির জাহাজ তৈরি করছে কোচি শিপইয়ার্ড (পশ্চিম নৌবহরের জন্য), আর বাকি আটটি আরনালা-শ্রেণির জাহাজ তৈরি করছে কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (পূর্ব নৌবহরের জন্য)। ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং মাহিন্দ্রা ডিফেন্স সিস্টেমসের মতো একাধিক দেশীয় সংস্থা এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে।

শিবাজির ঐতিহ্য বহন করছে জাহাজের নাম

মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ জেলার ঐতিহাসিক উপকূলীয় শহর মালভানের নামে নামকরণ করা হয়েছে এই জাহাজের, যা সপ্তদশ শতাব্দীর মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের নৌ-শক্তির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। জাহাজের প্রতীকচিহ্নে রয়েছে শিবাজির বিখ্যাত অস্ত্র ‘বাঘনখ’, এবং জাহাজের নীতিবাক্য “সাইলেন্ট ক্লজ”—যা নিঃশব্দে আঘাত হানার সক্ষমতাকেই তুলে ধরে।

উপসংহার

আইএনএস মালভানের কমিশনিং শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের নৌবহরে যুক্ত হওয়ার ঘটনা নয়—এটি ভারতের প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতার যাত্রায় আরও একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। ৮০ শতাংশের বেশি দেশীয় প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই জাহাজ যেমন প্রমাণ করে দেশীয় শিপবিল্ডিং শিল্পের ক্রমবর্ধমান দক্ষতা, তেমনই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সাবমেরিন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা কবচ হিসেবেও কাজ করবে এটি। আগামী দিনে আরও ১২টি জাহাজ নৌবহরে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা থাকায়, ভারতীয় নৌসেনার আধুনিকীকরণ এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট।

Leave A Reply

Exit mobile version