সংক্ষেপে: একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে পরিচিত ভারত এখন দ্রুত প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ডিআরডিও-র গবেষণা, দেশীয় প্রযুক্তি, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ এবং সরকারের নীতিগত সংস্কারের ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি রেকর্ড ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি হচ্ছে।
নিজস্ব সংবাদদাতা: ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে গত এক দশকে যে পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু উৎপাদনের পরিমাণেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। যে দেশ একসময় যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রের জন্য বিদেশের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, সেই ভারত আজ ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO)। গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দেশীয় শিল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংস্থাটি ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
রেকর্ড গড়ল ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি বেড়ে ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি প্রায় ৬২ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রতি বাড়তে থাকা আস্থারও প্রতিফলন।
কীভাবে বদলাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প?
গত কয়েক বছরে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে বিদেশি প্রযুক্তি ও আমদানির উপর নির্ভরতা বেশি ছিল, এখন দেশীয় গবেষণা, ডিজাইন এবং উৎপাদনের মাধ্যমে সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। ডিআরডিও বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, সেন্সর, বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
DRDO-র ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিরক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে DRDO ভারতের প্রধান প্রতিষ্ঠান। শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনই নয়, গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তিকে শিল্প পর্যায়ে উৎপাদনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করাও এই সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর ফলে গবেষণার ফল দ্রুত উৎপাদনে রূপ নিচ্ছে এবং দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্যের চাহিদা
ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্য এখন এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইসরায়েল, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মরিশাস, সেশেলস ও মালদ্বীপের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে।
সরকারি প্রকাশনায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্ববাজারে নিজেদের উপস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত করছে এবং একাধিক ভারতীয় সংস্থা আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হয়ে উঠেছে। নিচের সারণিটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত বুকলেটে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্য এবং সেগুলি যে দেশগুলিতে রপ্তানি হয়েছে বা হচ্ছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে।
এক নজরে: ভারত কোন প্রতিরক্ষা সামগ্রী কোন দেশে রপ্তানি করছে
| প্রতিরক্ষা পণ্য | যে দেশগুলিতে রপ্তানি করা হয়েছে |
|---|---|
| বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট | অস্ট্রেলিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কলম্বিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, মিশর, ইকুয়েডর, জার্মানি, ইরাক, ইসরায়েল, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবানন, মেক্সিকো, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ওমান, ফিলিপিন্স, পোল্যান্ড, কাতার, সৌদি আরব, সার্বিয়া, সিঙ্গাপুর, সোমালিয়া, স্পেন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE), যুক্তরাজ্য, উরুগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র |
| আর্মার শিল্ডিং | জার্মানি, মেক্সিকো, কম্বোডিয়া, সৌদি আরব |
| ALH ধ্রুব হেলিকপ্টার | মরিশাস, মালদ্বীপ, নেপাল |
| গোলাবারুদ (Ammunition) | কেনিয়া, বতসোয়ানা, তুরস্ক, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, বুলগেরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি |
| আগ্নেয়াস্ত্রের যন্ত্রাংশ | আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইসরায়েল, ইতালি, মন্টেনেগ্রো, নেপাল, ফিলিপিন্স, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র |
| ডোর্নিয়ার (Do-228) বিমান | মরিশাস, সেশেলস |
| চেতক হেলিকপ্টার | নামিবিয়া, সুরিনাম, নেপাল, মরিশাস |
| ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর বোট | মরিশাস, মোজাম্বিক, সেশেলস, মালদ্বীপ |
| প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স | ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র |
| ব্যাটারি | ফ্রান্স, সার্বিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পেরু, কুয়েত, ক্রোয়েশিয়া, ইসরায়েল, ভিয়েতনাম |
| অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল | মরিশাস, শ্রীলঙ্কা, সেশেলস |
| ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট | মরিশাস |
| কোস্টাল সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম | মরিশাস, সেশেলস, মালদ্বীপ |
| ইন্টারসেপ্টর বোট | মোজাম্বিক |
| হালকা টর্পেডো | একাধিক দেশ (নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ নেই) |
| সিমুলেটর | একাধিক দেশ (নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ নেই) |
| প্রতিরক্ষা সাব-সিস্টেম | যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড |
| এয়ারোস্পেস কম্পোনেন্ট | যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, যুক্তরাজ্য |
| ইঞ্জিনিয়ারিং পরিষেবা | যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস |
প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার দেশ
| দেশ | উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা পণ্য বা সহযোগিতা |
|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | এয়ারোস্পেস কম্পোনেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং পরিষেবা, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ |
| ইসরায়েল | থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম, যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি |
| ফ্রান্স | আর্মার প্যানেল, এয়ারোস্পেস কম্পোনেন্ট |
| জার্মানি | বুলেটপ্রুফ হেলমেট, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ |
| যুক্তরাজ্য | উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ |
| সংযুক্ত আরব আমিরশাহি | ব্যাটারি, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ |
| নেদারল্যান্ডস | বিমান কাঠামো (ফিউজলাজ), এয়ারোস্পেস উৎপাদন |
| ফিলিপিন্স | বুলেটপ্রুফ সরঞ্জাম, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ |
| শ্রীলঙ্কা | অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ইন্দ্রা মার্ক-II রাডার |
| বাংলাদেশ | টাটা হেক্সা প্রতিরক্ষা যান, মিগ-২৯ বিমানের ব্রেক প্যারাশুট উপাদান |
| ভিয়েতনাম | উচ্চগতির টহল নৌযান, সাবমেরিন ব্যাটারি ব্যবস্থা |
| সৌদি আরব | নাইট ভিশন ডিভাইস, বোমা ব্ল্যাঙ্কেট |
দ্রষ্টব্য: এই তথ্যগুলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য প্রদর্শিত উপর ভিত্তি করে তৈরি।
বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণে নতুন গতি
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে এখন সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠী, MSME এবং স্টার্টআপগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ইলেকট্রনিক সিস্টেম, ড্রোন এবং বিশেষায়িত উপকরণ তৈরিতে বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
নীতিগত সংস্কারের সুফল
প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়াতে কেন্দ্র সরকার গত কয়েক বছরে একাধিক নীতিগত সংস্কার করেছে। রপ্তানি লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা অ্যাটাশেদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচার, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ঋণ সহায়তা (Line of Credit), এবং পরীক্ষণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা উন্নত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিগুলির ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হয়েছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও বেড়েছে।
এখনও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামনে আরও বড় সাফল্য পেতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, উন্নত ইঞ্জিন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতার উপর আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সময়মতো সরবরাহ, উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন একটি ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিআরডিও-র গবেষণা, দেশীয় প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ এবং সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কারের ফলে ভারত আর শুধু অস্ত্র আমদানিকারক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে দ্রুত উত্থানশীল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রযুক্তির উপস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক আস্থা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা অর্থনীতিতে ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উৎপাদনের এই গতি বজায় থাকে, তবে আগামী দশকে ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশের কাতারে পৌঁছাতে পারে।

