ভারতীয় ফুটবলের ব্যর্থতার নেপথ্যে কী শুধু মাঠের পারফরম্যান্স? নাকি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত অসঙ্গতি এবং গ্রাসরুট উন্নয়নের অভাবই দেশের ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে?
ক্রীড়া ডেস্ক: ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অলিম্পিকে ক্রমশ উন্নতি, দাবা, ব্যাডমিন্টন, জ্যাভলিন বা শুটিংয়ে আন্তর্জাতিক সাফল্য। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলে ভারত এখনও পিছিয়ে। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও ভারতীয় পুরুষ ফুটবল দল একবারও ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া কিংবা উজবেকিস্তানের মতো এশিয়ার দেশগুলি নিয়মিত বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—সমস্যা কোথায়? প্রতিভায়, নাকি গোটা ফুটবল ব্যবস্থাতেই?
প্রতিভার অভাব নয়, সমস্যার শুরু কাঠামোতে
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, গোয়া, মণিপুর, মিজোরাম কিংবা পাঞ্জাব—দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলের উর্বর ভূমি। প্রতি বছর হাজার হাজার প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসেন। কিন্তু তাঁদের খুব কম সংখ্যকই আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেন।
কারণ, ফুটবলে সাফল্য কেবল প্রতিভার উপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন ১০-১৫ বছরের ধারাবাহিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, উন্নত কোচিং, নিয়মিত প্রতিযোগিতা, পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস সায়েন্স এবং আধুনিক ফুটবল অবকাঠামো। এই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোই এখনও ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
ক্রিকেটের অর্থনীতি, ফুটবলের সংকট
ভারতে খেলাধুলার অর্থনীতি মূলত ক্রিকেটকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পনসরশিপ, কর্পোরেট বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞাপনের বড় অংশই ক্রিকেটের দখলে। ফলে একজন কিশোর খেলোয়াড় বা তাঁর পরিবারের কাছে ক্রিকেট পেশা হিসেবে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
ফুটবলে এখনও সেই আর্থিক নিশ্চয়তা নেই। বহু ক্লাব আর্থিক সমস্যায় ভোগে, অনেক ফুটবলার অনিয়মিত বেতন পান এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত থাকে। ফলে প্রতিভাবান অনেক তরুণ অন্য পেশা বেছে নেন।
প্রশাসনিক সংকট: মাঠের বাইরের লড়াই
ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম বড় সমস্যা প্রশাসনিক অস্থিরতা। গত কয়েক বছরে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (AIFF)-কে ঘিরে আদালতের মামলা, সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে মতবিরোধ বারবার ফুটবল প্রশাসনকে চাপে ফেলেছে। এর প্রভাব পড়েছে লিগ পরিচালনা, ক্লাব পরিকল্পনা এবং খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের উপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফল ফুটবল দেশগুলিতে ফেডারেশন, সরকার, ক্লাব এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় থাকে। ভারতে সেই ধারাবাহিকতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সরকার কি যথেষ্ট করছে?
ভারত সরকার Khelo India, Sports Authority of India (SAI) এবং বিভিন্ন ক্রীড়া প্রকল্পের মাধ্যমে ফুটবলকে আর্থিক সহায়তা দেয়। তবে বরাদ্দের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ফুটবলের জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ বছরে বছরে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ প্রকল্প থাকলে বরাদ্দ বেড়েছে, আবার পরে তা কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু বরাদ্দের অঙ্ক নয়; বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে গ্রাসরুট ফুটবল, জেলা একাডেমি, কোচিং এবং বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
AIFF-এর আর্থিক বাস্তবতা
সাম্প্রতিক আর্থিক নথি অনুযায়ী, AIFF-এর আয় ১০০ কোটিরও বেশি হলেও প্রশাসনিক ও আইনি ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। ফুটবল উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের পাশাপাশি আদালত-সংক্রান্ত ও প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, উন্নয়নের তুলনায় প্রশাসনিক ব্যয় কি অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে?
ISL কি যথেষ্ট?
২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL) ভারতীয় ফুটবলে নতুন দর্শক, কর্পোরেট বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। কিন্তু একটি সফল শীর্ষ লিগ থাকলেই জাতীয় দল শক্তিশালী হয়ে ওঠে না।
জাপানের J.League কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার K League-এর সাফল্যের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার স্কুল, জেলা লিগ, যুব প্রতিযোগিতা এবং শক্তিশালী গ্রাসরুট ব্যবস্থা। ভারতে সেই সংযোগ এখনও দুর্বল।
সম্প্রতি ISL-এর বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ এবং সম্প্রচার অধিকার নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে।
রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলে?
ফুটবল বিশ্বের প্রায় সব দেশেই রাজনীতি ও প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, AIFF, আদালত এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবলকে শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রকল্প হিসেবে নয়, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, যুব উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সফট পাওয়ারের অংশ হিসেবে দেখার সময় এসেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বহু বছর ধরে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেছে।
ভারত কী শিখতে পারে?
জাপান ১৯৯৩ সালে J.League চালু করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে স্কুল ফুটবল, যুব একাডেমি এবং ক্লাব সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছে। আজ তারা সাতবার বিশ্বকাপে খেলেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে ধারাবাহিক বিনিয়োগের সুফল পেয়েছে। অন্যদিকে ভারত এখনও বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠার অপেক্ষায়।
পথটা কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন—
- জেলা ও ব্লক স্তরে ফুটবল অবকাঠামো গড়ে তোলা
- স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলকে বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোয় আনা
- বয়সভিত্তিক জাতীয় লিগ সম্প্রসারণ
- লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচের সংখ্যা বাড়ানো
- AIFF-এ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
- ক্লাবগুলিকে আর্থিকভাবে টেকসই করার পরিকল্পনা
- কর্পোরেট বিনিয়োগ এবং স্পনসরশিপ বৃদ্ধি
- স্পোর্টস সায়েন্স ও ডেটা অ্যানালিটিক্সকে আরও গুরুত্ব দেওয়া
উপসংহার
ভারতের ফুটবল ব্যর্থতার কারণ কোনও এক ব্যক্তি, এক সরকার বা এক সংস্থার উপর চাপানো যায় না। এটি বহু দশকের পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, গ্রাসরুট উন্নয়নের অভাব এবং ক্রিকেটকেন্দ্রিক ক্রীড়া অর্থনীতির সম্মিলিত ফল।
তবে আশা হারানোর কারণও নেই। ভারতের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তরুণ প্রজন্ম এবং ফুটবলের জনপ্রিয়তা—সবই দেশের বড় শক্তি। এখন প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল ফুটবল নীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং অন্তত ১৫-২০ বছরের ধারাবাহিক পরিকল্পনা। কারণ বিশ্বকাপে ওঠার স্বপ্ন কোনও এক মৌসুমে পূরণ হয় না; তা গড়ে ওঠে হাজার হাজার স্কুল মাঠ, শত শত একাডেমি এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক ভিত্তির উপর।

