ভারতের রেল পরিবহণে শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। ডিজেল ও বিদ্যুতের বাইরে এবার বিকল্প জ্বালানির পথে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে ভারতীয় রেল। আগামী ১৭ জুলাই হরিয়ানার জিন্দ রেলওয়ে স্টেশন থেকে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন-চালিত যাত্রীবাহী ট্রেনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরিবেশবান্ধব এই ট্রেন শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকেই নয়, ভারতের সবুজ জ্বালানি নীতি এবং আত্মনির্ভর প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প সফল হলে ভারত বিশ্বের সেই কয়েকটি দেশের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে, যেখানে হাইড্রোজেন প্রযুক্তিকে যাত্রী পরিবহণে ব্যবহার করা হচ্ছে। জার্মানি, জাপান, চিন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারতও এবার এই উন্নত প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ শুরু করছে।
জিন্দ থেকে সোনিপথ- ৮৯ কিলোমিটারের পরীক্ষামূলক পথেই শুরু
রেল বোর্ডের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ট্রেনটি হরিয়ানার জিন্দ থেকে সোনিপথ পর্যন্ত ৮৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। প্রতিদিন সকালে ৭টা ৪০ মিনিটে জিন্দ থেকে যাত্রা শুরু করে ৯টা ৪০ মিনিটে সোনিপথ পৌঁছবে। ফেরার পথে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সোনিপথ থেকে ছেড়ে দুপুর ১টার মধ্যে জিন্দে ফিরে আসবে।
পুরো যাত্রাপথে মোট ১২টি স্টেশনে ট্রেনটির নির্ধারিত স্টপেজ থাকবে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্বোধনের দিন এটি বিশেষ পরিষেবা হিসেবে চালানো হবে। পরে নিয়মিত যাত্রী পরিষেবার সূচি ঘোষণা করবে উত্তর রেলওয়ে।
এক দিনে প্রায় ৩৫৬ কিলোমিটার চলবে

রেল মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ট্রেনটি প্রতিদিন দুটি পূর্ণ রাউন্ড ট্রিপ সম্পন্ন করবে। ফলে দৈনিক মোট প্রায় ৩৫৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে এই হাইড্রোজেন ট্রেন।
১০ কোচের এই ট্রেনে রয়েছে ৬৮২টি আসন, তবে দাঁড়ানো যাত্রীসহ মোট প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী পরিবহণের সক্ষমতা রয়েছে। পরীক্ষামূলক চলাচলের সময় ট্রেনটি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুললেও নিয়মিত পরিষেবায় সর্বোচ্চ গতি ৭৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা রাখা হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা ও জ্বালানি দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
কীভাবে কাজ করে হাইড্রোজেন ট্রেন?
হাইড্রোজেন ট্রেনের মূল শক্তি আসে ফুয়েল সেল প্রযুক্তি থেকে। এখানে ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন (PEM) ফুয়েল সেল।
ট্রেনে সংরক্ষিত হাইড্রোজেন গ্যাস এবং বাতাসের অক্সিজেন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। সেই বিদ্যুৎ মোটর চালায় এবং ট্রেনকে গতিশীল করে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয় না। উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয় শুধু জলীয় বাষ্প এবং সামান্য তাপ। ফলে এটি শূন্য-নির্গমন (Zero Emission) প্রযুক্তির অন্যতম উদাহরণ।
ব্যাটারি ও ফুয়েল সেলের যুগলবন্দি
ট্রেনটিতে শুধু হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলই নয়, রয়েছে উন্নত লিথিয়াম-ফেরো-ফসফেট ব্যাটারি। ফুয়েল সেল ক্রমাগত বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, আর ট্রেন যখন দ্রুত গতি তুলবে বা অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হবে, তখন ব্যাটারি সেই চাহিদা পূরণ করবে।
আবার ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরায় ব্যাটারিতে সঞ্চিত হবে। এই ‘রিজেনারেটিভ ব্রেকিং’ প্রযুক্তির ফলে জ্বালানির অপচয় কমবে এবং ট্রেনের সামগ্রিক দক্ষতা বাড়বে।
কোথায় থাকবে হাইড্রোজেন?
এই ট্রেনে প্রায় ৪৪০ কেজি সংকুচিত হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা হবে।
উচ্চচাপ সহনশীল ২৭টি বিশেষ সিলিন্ডারে এই গ্যাস রাখা হবে, যা ট্রেনের দুই প্রান্তে স্থাপন করা হয়েছে। জিন্দে ইতিমধ্যেই একটি ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এখানে জলকে বিদ্যুতের সাহায্যে ভেঙে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হবে।
একবার জ্বালানি ভরলে ট্রেনটি প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারবে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব
হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস হওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।
ট্রেনে বসানো হয়েছে—
- হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর
- আগুন শনাক্তকারী সেন্সর
- ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা
- আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী পরীক্ষিত সিস্টেম
এছাড়া উদ্বোধনের পর প্রথম তিন মাস প্রতিটি যাত্রায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদ ট্রেনে উপস্থিত থাকবেন, যাতে যেকোনও প্রযুক্তিগত সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা যায়।
কেন বেছে নেওয়া হল জিন্দ-সোনিপথ রুট?
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুটটি নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
এটি একটি নন-ইলেকট্রিফায়েড রেলপথ, যেখানে এখনও ডিজেলচালিত DEMU পরিষেবা চলত। ফলে সম্পূর্ণ নতুন ট্রেন তৈরির বদলে বিদ্যমান ট্রেনকে হাইড্রোজেন প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া জিন্দে হাইড্রোজেন উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে এবং দিল্লির নিকটবর্তী হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণও তুলনামূলক সহজ।
ছয় বছরের গবেষণার ফল
এই প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয় ২০২০-২১ অর্থবর্ষে।
এরপর ধাপে ধাপে—
- পাইলট প্রকল্প অনুমোদন
- Medha Servo Drives-কে প্রযুক্তিগত দায়িত্ব প্রদান
- কানাডার Ballard Power Systems-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব
- জিন্দে গ্রিন হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট নির্মাণ
- RDSO-র মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন
- ২০২৫ সালে ট্রেন প্রস্তুত
- ২০২৬ সালে সফল ট্রায়াল
সব মিলিয়ে প্রায় ছয় বছরের গবেষণা ও উন্নয়নের পর বাস্তবে নামছে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন।
বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের ইতিহাস
হাইড্রোজেনচালিত রেল প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু হয় একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি খোঁজার লক্ষ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ শুরু করে। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পর বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেন Coradia iLint তৈরি করে ফরাসি সংস্থা Alstom।
২০১৬ সালে জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রেল প্রদর্শনী InnoTrans-এ প্রথম এই ট্রেনটি প্রদর্শিত হয়। প্রায় দুই বছর পরীক্ষামূলক চলাচলের পর ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্যে এটি নিয়মিত যাত্রী পরিষেবায় চালু হয়। এর মাধ্যমে জার্মানি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে হাইড্রোজেন ফুয়েল-সেলচালিত যাত্রীবাহী ট্রেনকে বাণিজ্যিক পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করে।
Coradia iLint একবার হাইড্রোজেন ভরলে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে এবং এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার। ট্রেনটি চলার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্য কোনও দূষণকারী গ্যাস নির্গত হয় না; কেবল জলীয় বাষ্প ও তাপ উৎপন্ন হয়। এই কারণেই একে শূন্য-নির্গমন (Zero Emission) রেল প্রযুক্তির অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
বর্তমানে জার্মানির পাশাপাশি চিন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি এবং দক্ষিণ কোরিয়া-সহ একাধিক দেশ হাইড্রোজেনচালিত রেল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক রেলপথে ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে, আর অনেক দেশ ডিজেলচালিত ট্রেনের বিকল্প হিসেবে হাইড্রোজেন ট্রেনকে ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করছে।
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশও এই বৈশ্বিক সবুজ রেল বিপ্লবের অংশ হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জিন্দ–সোনিপথ প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে এবং কাংড়া ভ্যালির মতো ঐতিহ্যবাহী ও পাহাড়ি রেলপথেও হাইড্রোজেন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে পারে। এর ফলে ভারতীয় রেলের কার্বন নিঃসরণ কমার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই গণপরিবহণের পথ আরও সুগম হবে।
বিশ্বের কোন দেশ এগিয়ে?
বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হাইড্রোজেন ট্রেন Alstom Coradia iLint ২০১৮ সালে জার্মানিতে চালু হয়।
বর্তমানে জার্মানি, জাপান, চিন, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
ভারতের ট্রেনটি বিশেষ কারণ, এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ব্রড-গেজ হাইড্রোজেন যাত্রীবাহী ট্রেন, যা সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে আরও ৩৫টি হাইড্রোজেন ট্রেন
ভারতীয় রেল ইতিমধ্যেই ‘Hydrogen for Heritage’ প্রকল্পের অধীনে আরও ৩৫টি হাইড্রোজেন ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই ট্রেনগুলি ভবিষ্যতে দার্জিলিং, নীলগিরি, কাংড়া উপত্যকা-সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ও পাহাড়ি রেলপথে চালানো হতে পারে, যেখানে বৈদ্যুতিক লাইন বসানো প্রযুক্তিগত বা আর্থিকভাবে কঠিন।
সবুজ অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন বার্তা
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন শুধু একটি নতুন রেল পরিষেবা নয়, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং আত্মনির্ভর শিল্পনীতিরও প্রতীক। জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর যে লক্ষ্য ভারত নিয়েছে, এই প্রকল্প সেই পথেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জিন্দ-সোনিপথ রুটে এই উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের আরও বহু নন-ইলেকট্রিফায়েড রেলপথে হাইড্রোজেন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যেতে পারে। ফলে রেল পরিবহণ যেমন আরও পরিবেশবান্ধব হবে, তেমনই বিশ্বব্যাপী সবুজ প্রযুক্তির দৌড়েও ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

