প্রতি বছর সেপ্টেম্বর এলেই নতুন আইফোনের অপেক্ষায় থাকেন প্রযুক্তিপ্রেমীরা। এতদিন অ্যাপল একসঙ্গে সাধারণ ও প্রো— দুই ধরনের আইফোন বাজারে আনার রীতি বজায় রেখেছিল। তবে আগামী প্রজন্মের আইফোন ১৮ সিরিজ়ে সেই পরিচিত ধারা বদলে যেতে পারে বলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে প্রযুক্তি মহলে। একই সঙ্গে কৃত্রিম মেধা (AI) নির্ভর নতুন ফিচার এবং যন্ত্রাংশের বাড়তি খরচের কারণে ভবিষ্যতের আইফোনের দামও আরও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

Photo: macrumors
প্রো মডেলের জন্য আলাদা মঞ্চ?
বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্লেষকের মতে, অ্যাপল এবার তাদের প্রিমিয়াম মডেলগুলিকে আলাদা গুরুত্ব দিতে চাইছে। সেই কারণেই আইফোন ১৮ প্রো, আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স এবং সম্ভাব্য প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোনকে আগে বাজারে আনা হতে পারে। অন্যদিকে সাধারণ আইফোন ১৮ এবং অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী সংস্করণ পরে বাজারে আসতে পারে।
এই কৌশল কার্যকর হলে অ্যাপলের পণ্য উন্মোচনের ক্যালেন্ডারেই বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। একই সঙ্গে বছরজুড়ে নতুন পণ্যকে কেন্দ্র করে বাজারে আগ্রহ ধরে রাখার সুযোগও পাবে সংস্থাটি।
কেন বাড়ছে প্রিমিয়াম মডেলের গুরুত্ব?
বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন বাজারে প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমে এলেও উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম ফোনের চাহিদা এখনও শক্তিশালী। সেই কারণে অ্যাপল তাদের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি প্রথমে প্রো সিরিজ়ে নিয়ে আসতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে “Apple Intelligence” নামে পরিচিত অ্যাপলের কৃত্রিম মেধা প্ল্যাটফর্ম আগামী দিনের আইফোন অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে। উন্নত AI ফিচার চালাতে আরও শক্তিশালী প্রসেসর, বেশি মেমরি এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে।
মেমরির দাম বাড়ায় চাপ
অ্যাপলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল মেমরি ও স্টোরেজ চিপের মূল্যবৃদ্ধি।
বর্তমানে AI ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বজুড়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমরির চাহিদা বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্মার্টফোন নির্মাতাদের উপরও। ফলে উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন বাড়তি খরচের বড় অংশ নিজেরাই বহন করলেও ভবিষ্যতে অ্যাপল সেই চাপের কিছুটা গ্রাহকদের উপর স্থানান্তর করতে পারে। অর্থাৎ, নতুন আইফোনের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ক্যামেরা ও ব্যাটারিতে বড় আপগ্রেড
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ়ে উন্নত ক্যামেরা প্রযুক্তি যুক্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে পরিবর্তনশীল অ্যাপারচার প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা বিভিন্ন আলোর পরিস্থিতিতে আরও উন্নত ছবি তুলতে সাহায্য করতে পারে।
পাশাপাশি বড় ব্যাটারি, উন্নত প্রসেসর এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকআপ দেওয়ার লক্ষ্যেও নকশাগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। AI-নির্ভর কাজ ফোনের ভিতরেই সম্পন্ন করতে হলে অতিরিক্ত শক্তি ও মেমরির প্রয়োজন হবে বলেই মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

Photo: macrumors
ভাঁজযোগ্য আইফোন কি সত্যিই আসছে?
স্মার্টফোন বাজারে স্যামসাং, হুয়াওয়ে ও অন্যান্য সংস্থা ইতিমধ্যেই ভাঁজযোগ্য ফোনের বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও অ্যাপল এখনও পর্যন্ত এই বিভাগে কোনও পণ্য আনেনি।
তবে আইফোন ১৮ প্রজন্মের সঙ্গে অ্যাপলের প্রথম ভাঁজযোগ্য ফোন আত্মপ্রকাশ করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলে জোর জল্পনা রয়েছে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে এটি হতে পারে গত এক দশকের মধ্যে অ্যাপলের সবচেয়ে বড় হার্ডওয়্যার পরিবর্তনগুলির একটি।
গ্রাহকদের সামনে নতুন সমীকরণ
অ্যাপলের সম্ভাব্য নতুন কৌশল গ্রাহকদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। এতদিন সেপ্টেম্বরেই সব মডেল সামনে থাকত। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি প্রো ও সাধারণ মডেলের লঞ্চ আলাদা সময়ে হয়, তাহলে অনেককেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— সঙ্গে সঙ্গে প্রিমিয়াম মডেল কিনবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন অপেক্ষাকৃত কম দামের সংস্করণের জন্য।
কী বলছে বাজার?
যদিও আইফোন ১৮ সিরিজ়, এর দাম বা লঞ্চের সময়সূচি সম্পর্কে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি অ্যাপল, তবুও প্রযুক্তি বাজারে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। AI, ভাঁজযোগ্য প্রযুক্তি এবং উন্নত হার্ডওয়্যারের যুগে প্রবেশ করতে চলা অ্যাপলের পরবর্তী প্রজন্মের আইফোন যে আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, সে বিষয়ে একমত অধিকাংশ বিশ্লেষক।
উপসংহার
আইফোন ১৮ সিরিজকে ঘিরে যে তথ্যগুলি সামনে আসছে, তাতে স্পষ্ট যে অ্যাপল শুধু একটি নতুন স্মার্টফোন বাজারে আনতে চাইছে না, বরং কৃত্রিম মেধা-নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের পণ্য কৌশল নতুনভাবে সাজাচ্ছে। RAM বৃদ্ধি, শক্তিশালী A20 চিপ, সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি এবং ধাপে ধাপে লঞ্চের পরিকল্পনা— সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী দিনের প্রতিযোগিতা আর শুধু ক্যামেরা বা ডিজাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং AI সক্ষমতা হবে স্মার্টফোন বাজারের প্রধান নির্ধারক।
বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে এখন যে AI প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেখানে গুগল, মাইক্রোসফট, স্যামসাং এবং ওপেনএআই-সমর্থিত প্রযুক্তিগুলির সঙ্গে পাল্লা দিতে অ্যাপলও বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। ফলে আইফোন ১৮ শুধু একটি নতুন ডিভাইস নয়, বরং অ্যাপলের দীর্ঘমেয়াদি AI কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মূল্য শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের কতটা বাড়তি খরচ বহন করতে বাধ্য করবে, সেটাই এখন নজরে রাখছে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমীরা।

