নিজস্ব সংবাদদাতা: ভারতীয় নৌবাহিনীর নতুন যুদ্ধজাহাজ Shruti, স্বনির্ভরতার আরেক ধাপ এগোলো দেশ কলকাতার Garden Reach Shipbuilders and Engineers অর্থাৎ GRSE তে জলে ভাসানো হলো ভারতীয় নৌবাহিনীর নতুন Next Generation Offshore Patrol Vessel বা NGOPV, “Shruti”। এই জাহাজ শুধু নৌবাহিনীর বহরে একটা নতুন সংযোজন নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১১৩ মিটার লম্বা এই জাহাজ সমুদ্র নজরদারি, জলদস্যুতা প্রতিরোধ এবং দুর্যোগ ত্রাণের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হবে।
১১ আগস্ট, ২০২৬ সালে কলকাতার হুগলি নদীর তীরে ঘটে গেল ভারতের সামুদ্রিক উত্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। NGOPV প্রকল্পের দ্বিতীয় জাহাজ “Shruti” এর উদ্বোধন শুধু বহরে একটা নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটা প্রমাণ করে যে ভারত এখন শুধু প্রযুক্তি কেনার দেশ নয়, বরং নিজেই সম্পূর্ণ জাহাজ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দক্ষতা অর্জন করেছে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে একটা নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে ভারত, আর এই NGOPV প্রকল্প সেই লক্ষ্যেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাত্র তিন মাসেই দ্বিতীয় জাহাজ
এই প্রকল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর গতি। এর আগে ২০ মে, ২০২৬ সালে জলে ভাসানো হয়েছিল এই সিরিজের প্রথম জাহাজ “Sanghmitra”। তার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল দ্বিতীয় জাহাজ Shruti, যা ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গতি বৃদ্ধির একটা স্পষ্ট প্রমাণ। এতদিন ধরে দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ তৈরির জন্য পরিচিত ছিল এই শিল্প, কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় জাহাজ তৈরির ঘটনা প্রমাণ করে যে ভারতীয় শিপইয়ার্ডগুলো এখন একটা স্থিতিশীল এবং দক্ষ উৎপাদন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ এবং সংগ্রহ শাখার প্রধান Vice Admiral Sanjay Sadhu এই অগ্রগতির পেছনে গত এক দশকের নীতিগত উদ্যোগের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন।
নামের পেছনের গল্প
“Shruti” শব্দের অর্থ হলো “যা শোনা হয়েছে”, যা সরাসরি চার বেদের সঙ্গে যুক্ত, ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরার সবচেয়ে প্রাচীন এবং পবিত্র গ্রন্থ, যা মৌখিক পরম্পরার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সংরক্ষিত হয়ে এসেছে। জাহাজটাকে জলে ভাসানোর সময় বৈদিক শ্লোক পাঠের মধ্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়, যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্য মিলেমিশে যায় আধুনিক ইস্পাত নির্মাণের সঙ্গে। জাহাজের ক্রেস্টেও রয়েছে সপ্তর্ষিমণ্ডল এবং লাল সাদা একটা বাতিঘরের প্রতীক, যা যথাক্রমে নৌপরিভ্রমণ এবং সতর্কতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
আগের প্রজন্মের Sukanya এবং Saryu শ্রেণির জাহাজের তুলনায় NGOPV শ্রেণির জাহাজ আকারে এবং সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। Shruti র দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৩ মিটার এবং প্রস্থ ১৪.৬ মিটার, ওজন প্রায় ৩ হাজার টন। জাহাজটার সর্বোচ্চ গতি ২৩ নট, আর ১৪ নট গতিতে চললে এর endurance দাঁড়ায় প্রায় ৮৫০০ নটিক্যাল মাইল। GRSE র চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর Commodore PR Hari র মতে, ৩ হাজার টনের এই ওজন জাহাজটাকে আরও শক্তিশালী অস্ত্রব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক সেন্সর বহন করার সক্ষমতা দিয়েছে। এই দীর্ঘ endurance নৌবাহিনীকে বিদেশি বন্দরের উপর নির্ভর না করেই ভারত মহাসাগর অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী জলদস্যুতা প্রতিরোধ এবং নজরদারি চালানোর সুযোগ দেবে।
কী কী কাজে ব্যবহৃত হবে
Shruti মূলত ব্যবহৃত হবে সমুদ্র নজরদারি, জলদস্যুতা প্রতিরোধ, উপকূলীয় সম্পদ রক্ষা, উদ্ধার অভিযান এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণের কাজে। এছাড়া সমুদ্রপথে নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত এবং জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এই জাহাজ।
GRSE এর দীর্ঘ ঐতিহ্য
১৯৬১ সালে ভারতের প্রথম indigenous জাহাজ INS Ajay সরবরাহ করার পর থেকে GRSE দেশের নৌ শিল্পের এক মজবুত স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে। এখন পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীকে ১১০টারও বেশি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করেছে এই শিপইয়ার্ড, আর মোট ৮০০টারও বেশি জাহাজ ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে দেশি বিদেশি বিভিন্ন গ্রাহকের জন্য। মোট ১১টা জাহাজের এই NGOPV প্রকল্পে GRSE র দায়িত্বে আছে চারটা জাহাজ নির্মাণের কাজ, বাকি সাতটা তৈরি হচ্ছে Goa Shipyard Limited এ। এ বছরই GRSE র লক্ষ্য পাঁচটা যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করা এবং চারটা জাহাজ জলে ভাসানো, যার মধ্যে দুটো ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে।
দুই উপকূলে একসঙ্গে নির্মাণ
এই প্রকল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক হলো একইসঙ্গে দুটো ভিন্ন উপকূলে জাহাজ নির্মাণের কাজ চালানো, কলকাতায় GRSE এবং গোয়ায় Goa Shipyard Limited। এই পদ্ধতি শুধু নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের লক্ষ্য পূরণের একটা উপায় নয়, বরং এটা দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় একক কোনো ঝুঁকির বিন্দু এড়ানোর একটা সুচিন্তিত কৌশলও বটে। পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূলে সমান্তরালভাবে উৎপাদন কেন্দ্র রাখার এই পদ্ধতি দেশের শিল্প ভিত্তিকে আরও স্থিতিস্থাপক করে তুলেছে।
পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে একই সঙ্গে নির্মাণের কৌশল
১১টি NGOPV নির্মাণের প্রকল্পটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল একই সঙ্গে দুটি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কলকাতার GRSE এবং গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড বা GSL একই প্রকল্পের আওতায় জাহাজ নির্মাণ করছে। এই ব্যবস্থা শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজ তৈরি করার জন্য নয়। এর মাধ্যমে ভারতের জাহাজ নির্মাণ পরিকাঠামোকে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটি মাত্র জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যবস্থাও আরও স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা থাকলে প্রয়োজনের সময় দ্রুত নৌবহরের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়।
আত্মনির্ভরতার দিগন্তে আরও এক ধাপ
‘শ্রুতি’র মতো নতুন প্রজন্মের টহলজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর সমুদ্রপথে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে। জলদস্যু দমন, সমুদ্র নজরদারি এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই শ্রেণির জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে ‘শ্রুতি’র গুরুত্ব শুধু একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ হিসেবে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং আত্মনির্ভরতার বৃহত্তর লক্ষ্য। ভারত যখন ক্রমশ নিজের প্রযুক্তি ও নিজস্ব শিল্পের উপর নির্ভর করে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে, তখন তার ভূমিকা শুধু নিজের জলসীমা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দেশটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে। আগামী দিনে ভারতীয় নৌবাহিনীর দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর শক্তি যত বাড়বে, ততই আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাবও বাড়তে পারে। ‘শ্রুতি’র জলावतরণ সেই দীর্ঘ যাত্রারই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
উপসংহার
Shruti র মতো জাহাজের অন্তর্ভুক্তি ভারতকে তার সামুদ্রিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এলাকায় একটা স্থায়ী এবং শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত এখন শুধু নিজের সীমানা রক্ষা করছে না, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। আগামী দিনে ভারত যত বেশি নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, ততই একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোয় তার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

