সংক্ষিপ্ত সার: প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে আবেগঘন ভাষণ দিলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। নিজের নির্বাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নারী পুরুষের সমানাধিকার, মানবাধিকার, যুক্তিবাদ ও বাকস্বাধীনতার পক্ষে লেখালেখির কারণেই তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। বক্তৃতায় তিনি ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেন এবং বলেন, কোনো মতের জবাব সহিংসতা নয়, যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সমান নাগরিক অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি আধুনিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান। কলকাতায় ফিরে তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই শহরে ফিরে আসতে পেরে তিনি আবেগাপ্লুত এবং মানুষের ভালোবাসাকেই নিজের প্রকৃত দেশ বলে মনে করেন।
কলকাতা ব্যুরো: দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবার কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আবেগঘন ভাষণে তিনি ফিরে দেখলেন নির্বাসনের দীর্ঘ পথচলা, তুলে ধরলেন বাকস্বাধীনতা, নারী পুরুষের সমানাধিকার, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান। তিনি বলেন, কোনো মতের জবাব সহিংসতা বা নির্বাসন হতে পারে না; তার উত্তর হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা ও মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে। একই সঙ্গে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সমান নাগরিক অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গড়ার আহ্বান জানান। বক্তৃতার শেষ মুহূর্তে কলকাতার প্রতি নিজের গভীর আবেগ প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, “কোনও মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।”
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, আবার কলকাতার মঞ্চে তসলিমা
কলকাতার সঙ্গে তসলিমা নাসরিনের সম্পর্ক শুধুমাত্র একটি শহরের সঙ্গে একজন লেখকের সম্পর্ক নয়। এই শহরে তিনি যেমন সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি পেয়েছেন, তেমনই একসময় রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে তাঁকে এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রায় উনিশ বছর পরে আবার কলকাতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি স্মরণ করেন সেইসব মানুষকে, যাঁরা অতীতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আর আজ বেঁচে নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা যদি আজকের এই প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হতে পারতেন, তবে নিশ্চয়ই আনন্দিত হতেন। এই মন্তব্যের মধ্যেই তাঁর দীর্ঘ নির্বাসনের যন্ত্রণা এবং কলকাতার প্রতি আবেগ ফুটে ওঠে।
‘আমি কোনো অপরাধ করিনি’-নির্বাসনের প্রসঙ্গে আবেগঘন বক্তব্য
নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি তুলে ধরতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি কখনও কোনো অপরাধ করেননি। তাঁর দাবি, তিনি কাউকে হত্যা করেননি, কারও ক্ষতি করেননি কিংবা কোনো ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি শুধুমাত্র একজন লেখক হিসেবে নিজের গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধে নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কথায়, লেখালেখির বিষয়বস্তু ছিল নারী ও পুরুষের সমান অধিকার, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের সমান মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার। কিন্তু সেই লেখাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নির্বাসনের জীবনে ঠেলে দেয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে, তিনি নিজের লেখালেখিকে অপরাধ হিসেবে কখনও মেনে নেননি। বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে তিনি একজন লেখকের মৌলিক অধিকার হিসেবেই দেখেন।
‘আমার নির্বাসন শুধু ব্যক্তিগত নয়’
তসলিমা নাসরিনের বক্তৃতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর নির্বাসন নিয়ে বিশ্লেষণ। তিনি বলেন, এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একজন লেখকের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর মতে, যখন কোনো রাষ্ট্র নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং ধর্মীয় বা রাজনৈতিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে, তখন সেটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেন, একজন লেখককে নির্বাসনে পাঠিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো পরিস্থিতি শান্ত করা যায়, কিন্তু এর ফলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। বরং যারা ভয় দেখায়, যারা হুমকি দেয়, তারা আরও উৎসাহিত হয়। তাঁর মতে, রাষ্ট্র যদি ভয়ের কাছে আপস করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকির ভিত্তি তৈরি হয়।
বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান
নিজের বক্তব্যে তসলিমা নাসরিন একাধিকবার বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতের বিরোধিতা করার উপায় কখনও সহিংসতা হতে পারে না। তিনি বলেন, একটি বইয়ের উত্তর আরেকটি বই হতে পারে, একটি মতের উত্তর আরেকটি মত হতে পারে। কেউ যদি কোনো বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হন, তবে তিনি যুক্তি দিয়ে তার বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু একজন লেখককে হত্যা, কারাবন্দি বা নির্বাসিত করার চেষ্টা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। তাঁর মতে, সমাজের সভ্যতা বোঝা যায় এই বিষয়টি দিয়ে যে, সেখানে ভিন্নমত কতটা নিরাপদ। জনপ্রিয় মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকাই যথেষ্ট নয়, অজনপ্রিয় মত প্রকাশের স্বাধীনতাও সমানভাবে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
নারী পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে দৃঢ় বার্তা
বক্তৃতার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল নারী অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান। তিনি বলেন, জন্ম, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার নির্ধারণ করা যায় না। একজন নারীর অধিকার কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাঁর মতে, মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং সমতার পরিপন্থী যে কোনো আইন বা সামাজিক বিধান পরিবর্তন করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের আইনের ভিত্তি হওয়া উচিত মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক সমতা, কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, নারীকে কখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা উচিত নয়। একজন নারীর নিজের শরীর, নিজের জীবন এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর তাঁরই অধিকার থাকা উচিত।
ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান
তসলিমা নাসরিন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি কোনো ধর্মের অনুসারীদের বিরুদ্ধে নন। তাঁর আপত্তি ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সেইসব মতাদর্শের বিরুদ্ধে, যেগুলি মানুষের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে, নারীকে বৈষম্যের মধ্যে রাখে এবং ভিন্নমতকে দমন করে। তিনি বিশেষভাবে ইসলামি মৌলবাদের সমালোচনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতায় নারী বৈষম্য, মুক্তচিন্তকদের ওপর নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই কারণেই তিনি এ বিষয়ে বেশি সরব হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ধর্মই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। মতাদর্শের সমালোচনা করা মানে সেই ধর্মের অনুসারীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো নয়। বরং সমালোচনার মধ্য দিয়েই সমাজে সংস্কার এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকা উচিত নয়’
বক্তৃতার পরবর্তী অংশে তসলিমা নাসরিন রাষ্ট্র, আইন এবং ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তাঁর মতে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে তার সংবিধান, আইনের শাসন এবং নাগরিকের সমান অধিকারের উপর, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকা উচিত নয়। আইনেরও কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। আইনের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার। একজন নাগরিকের অধিকার কখনোই তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, একজন নারীর অধিকারও তাঁর জন্ম, ধর্ম বা পারিবারিক পরিচয়ের উপর নির্ভর করতে পারে না। একজন নারীর নিজের শরীর, নিজের জীবন এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজেরই হওয়া উচিত।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে কী বললেন
তসলিমা নাসরিন তাঁর বক্তব্যে ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্যই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর সমর্থিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের ব্যক্তিগত আইনকে সবার উপর চাপিয়ে দেওয়ার ধারণা নয়। বরং তাঁর মতে, নাগরিক আইন এমন হওয়া উচিত যা সংবিধান, মানবাধিকার এবং নারী পুরুষের পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে তৈরি হবে। ধর্মীয় পরিচয় ভেদে আলাদা নাগরিক অধিকার থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, কোনো ধর্মীয় আইন যদি নারীকে পুরুষের সমান অধিকার না দেয়, তাহলে সেই আইন পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানুষের মর্যাদা ধর্মীয় বিধানের চেয়ে বড় হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘সমালোচনা মানেই বিদ্বেষ নয়’
ধর্ম নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি কোনো ধর্মাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে নন। তাঁর আপত্তি শুধুমাত্র সেইসব মতাদর্শের বিরুদ্ধে, যেগুলি মানুষের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে এবং বৈষম্যকে প্রতিষ্ঠা করে। তিনি বলেন, ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনা করা মানেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো নয়। একইভাবে অন্য কোনো ধর্মের সমালোচনাও সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, কোনো মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। মতাদর্শকে প্রশ্ন করা গণতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারণ প্রশ্ন এবং বিতর্কের মাধ্যমেই সমাজে পরিবর্তন আসে। তিনি আরও বলেন, মানুষকে রক্ষা করা জরুরি, মতাদর্শকে নয়। কোনো মতাদর্শের সমালোচনা করলেই তাকে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
মুক্তচিন্তকদের হত্যার প্রসঙ্গ তুলে উদ্বেগ
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তসলিমা নাসরিন বলেন, গত কয়েক দশকে বহু মুক্তচিন্তক, ব্লগার এবং লেখক প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করেছিলেন অথবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লিখেছিলেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য শুধু একজন মানুষকে হত্যা করা নয়; সমাজের অন্যদের উদ্দেশেও একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে প্রশ্ন করলে বা সমালোচনা করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ভয় সৃষ্টি করে কখনো মুক্তচিন্তা বন্ধ করা যায় না। একজন মানুষকে হত্যা করা গেলেও প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। একজন প্রশ্নকারীর মৃত্যু হলে সেই প্রশ্ন আরও বহু মানুষের কণ্ঠে ফিরে আসে।
প্রগতিশীলদের একাংশেরও সমালোচনা
বক্তৃতায় তসলিমা নাসরিন তথাকথিত প্রগতিশীল এবং উদারপন্থী মহলের একাংশেরও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে বাকস্বাধীনতা এবং নারী পুরুষের সমানাধিকারের সুবিধা ভোগ করলেও ইসলামি মৌলবাদের সমালোচনা করলেই সমালোচকদের ‘মুসলিমবিদ্বেষী’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, এই ধরনের মনোভাব প্রকৃতপক্ষে সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, নিজের সমাজের ভেতরে থাকা বৈষম্য বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, বরং সেই সমাজের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সমালোচনা। এই প্রসঙ্গে তিনি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদাহরণও টানেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা নিজেদের সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন বলেই তাঁদের অবদান ঐতিহাসিক হয়ে আছে।
বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদ
বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজের বক্তব্যে তসলিমা নাসরিন হতাশার পাশাপাশি আশার কথাও বলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, একদিন বাংলাদেশে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্র আলাদা থাকবে। নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন। মুক্তচিন্তক এবং নাস্তিকদের আর নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতে হবে না। তাঁর মতে, আশা মানে বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়। অন্ধকারকে চিনেও আলো তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নামই আশা।
উপমহাদেশ নিয়ে স্বপ্নের কথা
তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি এমন একটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখেন যেখানে ধর্মীয় বিদ্বেষের পরিবর্তে থাকবে বিজ্ঞানমনস্কতা, অজ্ঞতার পরিবর্তে শিক্ষা, সহিংসতার পরিবর্তে মানবিকতা এবং অসহিষ্ণুতার পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা। তিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রসঙ্গও উল্লেখ করে বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে ধর্মের নামে আর কোনো বিভাজন বা রক্তপাত না ঘটুক বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কলকাতায় ফিরে আবেগঘন সমাপ্তি
বক্তৃতার শেষ অংশে আবেগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তসলিমা নাসরিন বলেন, বহু বছর ধরে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছেন। এই শহর একসময় তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আবার এই শহর থেকেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল। তিনি বলেন, আজ তাঁর চোখে জল রয়েছে, মনে অভিমানও রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে অফুরন্ত ভালোবাসা।সবশেষে তিনি পশ্চিমবঙ্গ এবং কলকাতার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “কোনও মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর দীর্ঘ ভাষণের সমাপ্তি করেন।
উপসংহার
প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় ফিরে তসলিমা নাসরিনের এই ভাষণ শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়, বরং বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারী পুরুষের সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থানের পুনর্ব্যক্তি। বক্তৃতার বিভিন্ন অংশে তিনি নিজের নির্বাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি এমন একটি সমাজের স্বপ্নের কথাও বলেন, যেখানে যুক্তি, মানবিকতা এবং সমান অধিকারই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি।

