🟨 সারসংক্ষেপ: পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা (PM Vishwakarma) প্রকল্পের বাস্তবায়ন। রাজ্য সরকার মনিটরিং ও জেলা স্তরের বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করায় প্রকল্পটি চালুর পথ খুলেছে। ঐতিহ্যবাহী ১৮টি পেশার কারিগর ও শিল্পীরা এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ, টুলকিট সহায়তা, জামানতবিহীন ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনের প্রণোদনা এবং বিপণন সহায়তার মতো একাধিক সুবিধা পাবেন।
কলকাতা ব্যুরো: দীর্ঘ অপেক্ষার পর পশ্চিমবঙ্গে শুরু হচ্ছে কেন্দ্রের বহুল আলোচিত প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা (PM Vishwakarma) প্রকল্প। লোকসভায় কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করায় পশ্চিমবঙ্গে এখন এই প্রকল্প কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) প্রতিমন্ত্রী শোভা করন্দলাজে বৃহস্পতিবার লোকসভায় লিখিত উত্তরে জানান, ২০২৬ সালের ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্য পর্যায়ের মনিটরিং কমিটি এবং জেলা স্তরের বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এর ফলে রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ সুগম হয়েছে।
কোন কোন কারিগর পাবেন সুবিধা?
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্পের আওতায় ঐতিহ্যবাহী ১৮টি পেশার কারিগর ও শিল্পীরা সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছেন কাঠমিস্ত্রি, কামার, কুমোর, দর্জি, রাজমিস্ত্রি, মুচি, ঝুড়ি প্রস্তুতকারক, নাপিত, মাছ ধরার জাল প্রস্তুতকারক-সহ বিভিন্ন হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। বিশেষ করে এই পেশাগুলির সঙ্গে যুক্ত মহিলা কারিগররাও প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে জানিয়েছে কেন্দ্র।
কী কী সুবিধা মিলবে?
প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত কারিগর ও শিল্পীদের জন্য একাধিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ (Skill Training)
- আধুনিক টুলকিট কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা
- জামানতবিহীন ঋণ (Collateral-free Credit)
- ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহভাতা
- পণ্য বিপণন ও বাজারে পৌঁছানোর সহায়তা
- ব্যবসা সম্প্রসারণে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা
কেন্দ্রের মতে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আয় বাড়ানো এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ।
বাস্তবায়ন নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈঠক
প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে চলতি বছরের ২২ মে কেন্দ্রীয় MSME মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব ও ডেভেলপমেন্ট কমিশনার ড. রজনীশ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উপযুক্ত উপভোক্তা চিহ্নিতকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাজ্যের MSME খাতকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য MSME প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও মতবিনিময় করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গে মুদ্রা ঋণেও বড় সাফল্য
লোকসভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা (PMMY) চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে মোট ৫.৮২ কোটি ঋণ অনুমোদিত হয়েছে। এই ঋণের মোট পরিমাণ প্রায় ৩.৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। কেন্দ্রের দাবি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্বনিযুক্ত উদ্যোগের প্রসারে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্যও একাধিক উদ্যোগ
কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, দেশের মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্যও বিভিন্ন MSME প্রকল্প চালু রয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলের মহিলা উদ্যোক্তা ও মৎস্যজীবীদেরও এই উদ্যোগগুলির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। উদ্যোগ পোর্টাল (Udyam Registration Portal) এবং উদ্যোগ অ্যাসিস্ট পোর্টালে নিবন্ধিত মহিলা মালিকানাধীন সংস্থাগুলি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ, সরকারি ক্রয় নীতি, ক্রেডিট গ্যারান্টি, বিপণন সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারে।
উদ্ভাবনী উদ্যোগেও আর্থিক সহায়তা
MSME Innovative Scheme-এর ইনকিউবেশন অংশের মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক ধারণাকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ২৩টি স্বীকৃত হোস্ট ইনস্টিটিউট এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রতিটি অনুমোদিত উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে কেন্দ্র জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্প কী?
২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্প চালু হয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য দেশের ঐতিহ্যবাহী কারিগর ও হস্তশিল্পীদের অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করা। প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, সহজ শর্তে ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ এবং বাজারে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মতো একাধিক সুবিধা একসঙ্গে দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বহু বছর ধরে কাঠমিস্ত্রি, কুমোর, কামার, দর্জি কিংবা অন্যান্য হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ আধুনিক বাজারে টিকে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, টুলকিট সহায়তা এবং বিপণনের সুযোগ যদি কার্যকরভাবে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে শুধু ব্যক্তিগত আয় নয়, পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিও নতুন গতি পেতে পারে। এখন নজর থাকবে, প্রকল্পের সুবিধা কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।

