লাদাখের পরিবেশ আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস-বিতর্ক— একাধিক ইস্যুতে বারবার শিরোনামে উঠে এসেছেন প্রকৌশলী তথা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। সম্প্রতি নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ফের সক্রিয় হতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ঠিক কে এই সোনম ওয়াংচুক, আর কেন বারবার আলোচনায় আসেন তিনি— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে দেখা যাক তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা অধ্যায়।
শিক্ষা সংস্কারের হাত ধরে যাত্রা শুরু
১৯৬৬ সালে তৎকালীন জম্মু-কাশ্মীরের (বর্তমানে লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) আলচি গ্রামে জন্ম সোনম ওয়াংচুকের। গ্রামে স্কুল না থাকায় ৯ বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছেই মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। পরে শ্রীনগরে স্কুলে ভর্তি হলেও, ভাষাগত সমস্যার কারণে তাঁকে ভুল বোঝা হত বলে নিজেই স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন তিনি। শ্রীনগরের রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে এনআইটি শ্রীনগর) থেকে যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক হওয়ার পরে ১৯৮৮ সালে নিজের ভাই এবং কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অফ লাদাখ’ (সেকমল)। লাদাখের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে চালু হয় তাঁর ‘অপারেশন নিউ হোপ’ প্রকল্প।
বরফের স্তূপ এবং পরিবেশ-উদ্ভাবনের পরিচিতি
লাদাখের কৃষকদের বসন্তকালীন জলসঙ্কট মেটাতে ২০১৩-১৪ সালে ‘আইস স্তূপা’ প্রযুক্তি তৈরি করেন ওয়াংচুক, যেখানে শীতের অব্যবহৃত জলকে শঙ্কু আকৃতির বরফ-স্তূপে পরিণত করে গরমকালে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। এই উদ্ভাবন শুধু লাদাখেই নয়, সিকিম, নেপাল এমনকি সুইজারল্যান্ডের আল্পসেও প্রয়োগ করা হয়েছে বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ ব্যবস্থাপনার কাজে। সৌরশক্তিচালিত এবং জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ক্যাম্পাস তৈরির জন্যও পরিচিত সেকমল, যা ২০১৬ সালে ফ্রান্সে আন্তর্জাতিক টেরা পুরস্কার জিতে নেয়। ২০২১ সালে ভারতীয় সেনার জন্য সৌরশক্তিচালিত তাঁবুও ডিজাইন করেন তিনি, যা উচ্চ পার্বত্য এলাকায় কর্মরত জওয়ানদের উষ্ণতা দিতে সাহায্য করে।
পরবর্তীতে স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমোর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অলটারনেটিভস, লাদাখ (এইচআইএএল), যার লক্ষ্য পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা মাথায় রেখে উচ্চশিক্ষার নতুন মডেল তৈরি করা।
২০২৩ সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে তুলনা
২০০৯ সালে রাজকুমার হিরানি পরিচালিত ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে আমির খান অভিনীত ফুংসুক ওয়াংড়ু চরিত্রটি ওয়াংচুকের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত বলে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যদিও নিজে এই তুলনা মেনে নেননি ওয়াংচুক।
লাদাখের স্বশাসন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় লাদাখকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন ওয়াংচুক। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে খারদুংলা পাসে অনশনে বসার চেষ্টা করলে তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যদিও পুলিশের দাবি ছিল অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণেই তাঁকে ওই এলাকায় যেতে দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চে ফের আমরণ অনশন এবং একুশ দিনের জলবায়ু অনশন কর্মসূচি পালন করেন তিনি। সেই বছরের সেপ্টেম্বরে লাদাখ থেকে দিল্লি পর্যন্ত পদযাত্রার সময়ে দিল্লি পুলিশ তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গীদের সিংঘু সীমান্তে আটক করে, দু’দিন পরে ছাড়া পান তিনি।
গ্রেফতারি এবং জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে লেহ-তে এক বিক্ষোভ চলাকালীন বিজেপি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং লাদাখ হিল কাউন্সিলের প্রাঙ্গণ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশি ধরপাকড়ে চার জন প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন বলে জানা যায়, এরপর কার্ফু জারি এবং ব্যাপক গ্রেফতারি চালানো হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই বিক্ষোভে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ আনে ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে, যা তিনি অস্বীকার করেন এবং জানান, সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল এই বিক্ষোভ। হিংসা শুরুর প্রথম দিকে শান্তি বজায় রাখার আবেদনও জানিয়েছিলেন তিনি বলে জানা গিয়েছে।
দু’দিন পরে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের (এনএসএ) আওতায় লাদাখের পুলিশ মহানির্দেশকের নেতৃত্বে তাঁকে আটক করে জোধপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এই সময়ে লেহ-তে ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়। সেকমলের বিরুদ্ধে বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে তাদের এফসিআরএ লাইসেন্স বাতিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, আর এইচআইএএল নিয়েও তদন্ত শুরু করে সিবিআই। ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে পাকিস্তান-যোগের অভিযোগও তোলা হয়েছিল, যা পরে ভিত্তিহীন বলে জানা যায়— ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ ও ডন মিডিয়া আয়োজিত একটি হিমালয় জলবায়ু সম্মেলনে স্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গটিকেই এই অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন জানানোর পরে দীর্ঘ শুনানি পর্ব শেষে ২০২৬ সালের মার্চে এনএসএ প্রত্যাহার করে ওয়াংচুককে মুক্তি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
নিট বিতর্কে নতুন করে সরব
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলনের সমর্থনে নিজেকে ‘সাম্মানিক ককরোচ’ বলে অভিহিত করে সামনে আসেন ওয়াংচুক। নিট ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই-র অনস্ক্রিন মূল্যায়ন সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তরমন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। জুন মাসের শেষ থেকে সর্বভারতীয় ছাত্র সংগঠনের (এআইএসএ) কয়েকজন পড়ুয়ার সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের অনশনও শুরু করেছেন তিনি।
একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত
লাদাখের শিক্ষা এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে অবদানের জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ১৫টি পুরস্কার পেয়েছেন সোনম ওয়াংচুক, যার মধ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ফর সাসটেনেবল আর্কিটেকচার এবং ২০১৬ সালের রোলেক্স অ্যাওয়ার্ডস ফর এন্টারপ্রাইজ়।
উপসংহার:
শিক্ষা সংস্কার থেকে জলবায়ু আন্দোলন, লাদাখের স্বশাসনের দাবি থেকে সাম্প্রতিক নিট প্রশ্নফাঁস-বিতর্ক— চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় নানা ভাবে জড়িয়ে থেকেছেন সোনম ওয়াংচুক। এক দিকে যেমন তাঁর উদ্ভাবন এবং শিক্ষা-সংস্কারের কাজ তাঁকে এনে দিয়েছে দেশ-বিদেশের একাধিক সম্মাননা, তেমনই সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত এবং ২০২৫ সালের গ্রেফতারি-বিতর্ক তুলে ধরেছে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যেকার জটিল সম্পর্কের ছবিও। বর্তমানে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে, বিতর্ক ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সামাজিক ইস্যুতে সরব হওয়া থেকে পিছপা হননি তিনি। আগামী দিনে তাঁর এই আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকেই এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

